আধুনিক যুগের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইমোজি এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। গত এক বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় ইমোজির মুকুট এখন চোখ থেকে জল গড়ানো সেই ছোট্ট হলুদ মুখটির মাথায়। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রতীক আমাদের কথা বলার ধরন বদলে দিলেও, এই বিশেষ মিশ্র অর্থযুক্ত ইমোজিটি মানুষের মস্তিষ্কে গভীর প্রভাব ফেলছে।

এর ব্যবহার এখন বহুমুখী। কেউ নতুন চাকরি পেয়েছেন? সেখানেও ব্যবহৃত হচ্ছে কান্নার ইমোজি। অদ্ভুত কোনো কারণে কারও সঙ্গে দেখা করতে গেছেন? সেখানেও কান্নার ইমোজি। এমনকি সোফা থেকে কুকুরটি পড়ে গেলেও ব্যবহৃত হচ্ছে সেই একই কান্নার ইমোজি। গুগলের পক্ষ থেকে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া তথ্যানুসারে, চোখের কোণ থেকে জল গড়ানো এই হলুদ বৃত্তাকার ইমোজিটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ইমোজির স্বীকৃতি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হোয়াটসঅ্যাপের ব্যক্তিগত চ্যাটের দিকে তাকালে দেখা যায়, কেবল শেষ ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই এটি ১৫ বার ব্যবহার করা হয়েছে!

ঐতিহাসিকভাবে আনন্দ প্রকাশের জন্য কান্না-হাসি বা পাশে কাত হওয়া ইমোজিগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় থাকলেও, অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এখন এগুলোকে অনেকটা পুরোনো বা মান্ধাতা আমলের মনে হয়। আপনি যদি নিজের বয়স লুকিয়ে তরুণ দেখাতে চান, তবে ৩০ বছরের কম বয়সী কাউকে ওই পুরোনো ইমোজি পাঠালে তারা উত্তরে আপনাকে হাসিতে মৃত মাথার খুলির ইমোজি পাঠিয়ে দেবে। এছাড়া দুটি বিয়ারের গ্লাস, চোখ ঢাকা বানর কিংবা সানগ্লাস পরা হাসিমুখের ইমোজির মতো প্রতীকগুলো এখন জেন-জিদের কাছে প্রায় ব্রাত্য। বলা চলে, এগুলো এখন ডিজিটাল ডাস্টবিনে ফেলার সময় এসেছে।

নতুন কোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড বা শিল্পকর্মের মতোই ২০২৫-২৬ সালে এসে ইমোজির মূল আকর্ষণ এখন এর মৌলিকত্বের ওপর নির্ভরশীল। তাই এটি খুব একটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, তরুণ প্রজন্ম স্মার্টফোন ব্যবহার করে আগের মতোই আবেগ প্রকাশ করলেও, তা ফুটিয়ে তোলার ছবির ধরন বদলে গেছে। ভাঙা হৃদয়ের বদলে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ঝরে পড়া বা মলিন গোলাপ, আর বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে লাইক দেওয়ার পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে জোড়হাতের প্রতীক। এমনকি মোয়াই স্ট্যাচু ইমোজিটি ২০২১ সালে ৪৮২তম অবস্থানে থাকলেও এখন তা ৩৩তম অবস্থানে উঠে এসেছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, ভ্রু কুঁচকানো বা ভাবলেশহীন মুখভঙ্গির বদলেই এখন এটি বেশি ব্যবহৃত হয়।

অ্যাপলের সদ্য প্রকাশিত জেন-জি প্রিয় ইমোজির তালিকায় রয়েছে চোখের নিচে ব্যাগ বা কালচে দাগ থাকা মুখ, যা চরম ক্লান্তি, মানসিক চাপ কিংবা কৌতুকপূর্ণ হতাশা প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। যেমন—মা যখন সবজি খিচুড়ি রান্না করেন, তখন তার বিপরীতে মুহূর্তেই ব্যবহার করা যেতে পারে ক্লান্ত মুখের এই ইমোজি। চলতি বছরের মার্চ মাসে ইমোজি কি–বোর্ডে যুক্ত হওয়া আরেকটি আকর্ষণীয় সংযোজন হলো বিকৃত মুখ, যার চোখ দুটি মাথার প্রায় শেষ প্রান্তে চলে গেছে। উদ্বেগ, অস্বস্তি, আতঙ্ক বা সার্বিক হতাশা প্রকাশের জন্য এটি অত্যন্ত উপযুক্ত। মূলত নতুনত্বই এখন সবকিছুর মূল চাবিকাঠি।

জরিপের কাজে যখন এক সম্পাদককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি আনন্দ প্রকাশ করতে ম্যারাডোনা বা মারাকাস ইমোজি ব্যবহার করার কথা জানান। সুতরাং, আপনি যদি জেন-জির সঙ্গে তাল মেলাতে চান, তবে এমন কিছু সৃজনশীল ইমোজি ব্যবহারের মানসিকতা রাখা প্রয়োজন।

ইমোজির ব্যবহারকে অনেকে অপ্রাসঙ্গিক বা ছেলেমানুষি বলে উড়িয়ে দিলেও, এই প্রতীকগুলো আজ নিজস্ব এক ভাষায় পরিণত হয়েছে। অর্থ প্রকাশের জন্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এই প্রতীকগুলোর ওপর নির্ভর করছেন।

যোগাযোগ রক্ষায় ইমোজির গুরুত্ব বাড়লেও এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে ইমোজি ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম। আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা নতুন ধরনের এই অ-মৌখিক যোগাযোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণে তাঁরা কিছুটা পিছিয়ে থাকেন। যাঁরা এই বিষয়ে নতুন, তাঁদের সহায়তার জন্য ইমোজিপেডিয়া নামক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি প্রথমবারের মতো ‘কান্না-হাসি’ ইমোজিকে বছরের সেরা শব্দ হিসেবে ঘোষণা করেছিল, যা সে সময় ভাষাগত এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করে।

বোর্নমাউথ ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইমোজি মানুষের আসল মুখের অভিব্যক্তি প্রক্রিয়াকরণের সময় মস্তিষ্কে যে ধরনের স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, ইমোজি দেখলে ঠিক একই ধরনের নিউরাল রেসপন্স প্যাটার্ন বা স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। গবেষণার প্রধান গবেষক ম্যাডেলিন মলি এলি বলেন, “এটি প্রমাণ করে, ইমোজি কেবল ডিজিটাল যোগাযোগের কোনো মজার সংযোজন নয়, সত্যিকারের মুখের অভিব্যক্তির মতো করেই এগুলো আমাদের মস্তিষ্ক দ্বারা প্রক্রিয়াজাত হয়।” এই অর্থে, অনলাইন মিথস্ক্রিয়ার সময় ইমোজিগুলো অত্যন্ত অর্থপূর্ণ আবেগময় সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।

তাই চলতি বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ইমোজিকে আপনি আনন্দ হিসেবে দেখছেন নাকি বিষাদ হিসেবে, তা সত্যিই আপনার মস্তিষ্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। টিকটকের এক ব্যবহারকারী হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, “আমরা আসলে যখন কান্নাকাটি করি, সেটা ছাড়া বাকি সব সময়ই এই ইমোজি ব্যবহার করি।” কথাটি থেকে আপনি যা বোঝার বুঝে নিতে পারেন।