একেকজন একেকভাবে লেখেন। কেউ ছোট ছোট অক্ষরে লেখেন, কেউ বা বড় বড় করে। আবার বয়স, অভ্যাস বা লেখার গতির কারণেও মানুষের হাতের লেখায় পরিবর্তন আসে। তবে আগে থেকে স্বাভাবিক থাকা হাতের লেখা যদি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়, অক্ষরগুলো কাঁপা বা আঁকাবাঁকা হতে থাকে বা কলম ধরে লিখতে কষ্ট হয়, তাহলে বিষয়টি একেবারে অবহেলা করা ঠিক না।
এর মূল কারণ, হাতের লেখা শুধু হাতের কাজ না। মস্তিষ্কের নির্দেশ, স্নায়ুর মাধ্যমে সেই নির্দেশ পৌঁছানো এবং হাতের পেশির সমন্বয়েই আমরা লিখতে পারি। এই প্রক্রিয়ার কোনো অংশে যদি সমস্যা হয় তাহলে হাতের লেখাতেও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে হাতের লেখায় পরিবর্তন দেখা দিলে তা কখনো কখনো স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
এনডিটিভিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গিরিশ নায়ার হাতের লেখায় স্থায়ী পরিবর্তনের সম্ভাব্য কারণ ও এ বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তবে মনে রাখতে হবে, হাতের লেখা বদলে যাওয়া মানেই কোনো নির্দিষ্ট রোগ হয়েছে, বিষয়টা এমন না।
হাতের লেখা ছোট হয়ে আসা কি কোনো রোগের লক্ষণ?
অনেক ক্ষেত্রে আগে স্বাভাবিক আকারে লিখলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাতের লেখা ছোট হয়ে আসতে পারে। কখনো একটি বাক্য লেখার শুরুতে অক্ষরগুলো স্বাভাবিক থাকলেও শেষের দিকে ক্রমেই ছোট হতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় মাইক্রোগ্রাফিয়া।
মাইক্রোগ্রাফিয়া পারকিনসনস রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পরিচিত লক্ষণ। এই রোগে মস্তিষ্কের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। আর এর ফলে হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাবে অক্ষরের আকার ছোট হতে পারে এবং লেখা আগের তুলনায় জটিল বা অস্পষ্ট হতে পারে।
পারকিনসনস রোগে হাতের লেখার পরিবর্তনের পাশাপাশি হাত কাঁপা, পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চলাফেরা ধীর হয়ে আসার মতো নানান লক্ষণও দেখা দিতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যাবে, এমনটা বলা যায় না।
হাতের লেখা ছোট হয়ে এলেই পারকিনসনস হয়েছে - এটাও ধরে নেওয়া যায় না। তবে, এমন পরিবর্তন নিয়মিত হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অক্ষর আঁকাবাঁকা হলে বা কলম ধরতে কষ্ট হলে
হাতের লেখায় আরেক ধরনের পরিবর্তন হলো অক্ষর আঁকাবাঁকা হয়ে যাওয়া, শব্দের মধ্যে দূরত্ব ঠিক রাখতে না পারা বা লিখতে গিয়ে হাতের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। পাশাপাশি কখনো কখনো আঙুলে টান ধরতে পারে, হাত দুর্বল লাগতে পারে বা কলম ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এসব সমস্যার পেছনে হাতের পেশি, স্নায়ু বা মস্তিষ্কের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার সমস্যা থাকতে পারে। কিছু স্নায়বিক রোগে হাতের পেশির শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে কমে যাওয়ায় লেখার ধরনও বদলে যায়।
মোটর নিউরন রোগের মতো কিছু জটিল স্নায়বিক সমস্যায় পেশির দুর্বলতা, হাতের পেশি শুকিয়ে যাওয়া এবং দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা হতে পারে। তবে শুধু হাতের লেখা দেখে এ ধরনের রোগ শনাক্ত করা সম্ভব না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করে থাকেন।
হাতের লেখা বদলানোর সব কারণ কি মস্তিষ্কের রোগ?
না। হাতের লেখা পরিবর্তনের পেছনে অনেক সাধারণ কারণও থাকতে পারে। যেমন-
হাত বা কবজিতে ব্যথা: গিঁটের সমস্যা, বাত বা অন্য কোনো কারণে হাত ব্যথা করলে স্বাভাবিকভাবে লেখা কঠিন হতে পারে।
হাতের পেশিতে ক্লান্তি: দীর্ঘ সময় লিখলে হাতের গতি ও অক্ষরের আকার বদলে যেতে পারে।
স্নায়ুতে চাপ: কবজি বা হাতের স্নায়ুতে চাপ পড়লে আঙুলে ঝিনঝিন করা, অসাড়তা কিংবা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
কাঁপুনি: হাত কাঁপার কারণে অক্ষর কাঁপা বা অসমান হতে পারে।
পরিস্থিতিগত পরিবর্তন: তাড়াহুড়া, অস্বস্তিকর অবস্থায় লেখা কিংবা ভিন্ন কলম ব্যবহারের কারণেও হাতের লেখায় সাময়িক পরিবর্তন আসতে পারে।
তাই একদিন হাতের লেখা খারাপ হলেই আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তবে পরিবর্তনটি দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমশ বাড়তে থাকলে বা এর সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কোন লক্ষণগুলো একসঙ্গে দেখা দিলে সতর্ক হবেন?
হাতের লেখায় পরিবর্তনের পাশাপাশি নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন-
হাত বা আঙুলে কাঁপুনি
হাতের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া
আঙুলের নড়াচড়া ধীর হয়ে আসা
কলম ধরতে বা ছোটখাটো কাজ করতে অসুবিধা
হাতের শক্তি কমে যাওয়া
পেশি অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে যাওয়া
হাতের কাজের সমন্বয় নষ্ট হওয়া
এ ধরনের লক্ষণ নতুন করে দেখা দিলে বা ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজন হলে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার জরুরি।
কখন জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে?
হাতের লেখায় পরিবর্তন যদি হঠাৎ শুরু হয় এবং একই সঙ্গে শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অসাড় হয়ে যায়, কথা জড়িয়ে যায়, বিভ্রান্তি দেখা দেয় বা মুখ বেঁকে যায়, তাহলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। মনে রাখবেন, এগুলো স্ট্রোকের লক্ষণও হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে অপেক্ষা করে দেখা বা নিজে নিজে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করা ঠিক না। এমন হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। খেয়াল রাখবেন, উপসর্গ কিছুক্ষণ পর কমে গেলেও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, হাতের লেখা কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে ধীরে ধীরে বদলাতে থাকলে, সঙ্গে হাত কাঁপা বা চলাফেরা ধীর হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
হাতের লেখার পরিবর্তন কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে জানতে চাইবেন, কখন থেকে হাতের লেখায় পরিবর্তন হচ্ছে, তা ধীরে নাকি হঠাৎ শুরু হয়েছে এবং অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে কি না। এরপর হাতের শক্তি, আঙুলের নড়াচড়া, পেশির টান, কাঁপুনি ও শরীরের সমন্বয় পরীক্ষা করতে পারেন।
রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী আরও কিছু পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। সব ক্ষেত্রে একই পরীক্ষা লাগে, এমনও না। চিকিৎসক যে লক্ষণগুলো দেখতে পাচ্ছেন, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হয়।
হাতের লেখার পরিবর্তন নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে আগের লেখা বা স্বাক্ষরের নমুনা সঙ্গে রাখা উপকারী হতে পারে। এতে পরিবর্তনের ধরন বোঝা সহজ হয়।
হাতের লেখা বদলালে কী করবেন?
প্রথমে পরিবর্তনটি সাময়িক, নাকি নিয়মিত হচ্ছে, তা খেয়াল করুন। কয়েক দিন পরপর একই ধরনের লেখা লিখে অক্ষরের আকার, দূরত্ব ও হাতের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন হচ্ছে কি না লক্ষ্য করতে পারেন।
তবে নিজে নিজে পারকিনসনস বা অন্য কোনো স্নায়বিক রোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না। একই সঙ্গে হাতের লেখার পরিবর্তনকে বয়স বা ক্লান্তির স্বাভাবিক ফল ভেবে দীর্ঘদিন উপেক্ষাও করবেন না।
পরিবর্তনটি স্থায়ী হলে বা অন্য উপসর্গের সঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আর হঠাৎ হাতের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সঙ্গে কথা জড়িয়ে যাওয়া বা শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন।
হাতের লেখা আমাদের মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও হাতের পেশির সমন্বিত কাজের ফল। তাই দীর্ঘদিন ধরে লেখার ধরন বদলে যাওয়া কখনো কখনো শারীরিক সমস্যার সূত্র দিতে পারে। বিশেষ করে অক্ষর ক্রমেই ছোট হয়ে আসা, হাত কাঁপা কিংবা কলম ধরে লিখতে অসুবিধা হলে বিষয়টি খেয়াল করা দরকার।
তবে হাতের লেখা বদলানো মানেই গুরুতর রোগ নয়। পরিবর্তনটি কত দিন ধরে হচ্ছে, কী ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে এবং সঙ্গে অন্য কোনো লক্ষণ রয়েছে কি না, এসব বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসকই সঠিক কারণ নির্ণয় করতে পারবেন।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে ‘Your Handwriting Has Changed: Could Your Brain Be Telling You Something?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।