সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, মনোযোগ ধরে রাখা এবং মানসিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি। তবে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা রাতে মাত্র চার থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েও সকালে সম্পূর্ণ সতেজ বোধ করেন এবং সারাদিনের যাবতীয় কাজ স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করতে পারেন।

বিজ্ঞানীরা এই বিরল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিদের বলেন ন্যাচারাল শর্ট স্লিপার (Natural Short Sleeper)। তাদের ক্ষেত্রে কম ঘুমের কারণ কেবল ব্যস্ত জীবনযাপন বা বিশেষ কোনো অভ্যাস নয়। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষের জিনে বিরল পরিবর্তনের কারণে তাদের ঘুমের স্বাভাবিক চাহিদা প্রভাবিত হয়।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা এমন মানুষদের জিন নিয়ে গবেষণা করছেন, যাতে বোঝা যায় মস্তিষ্ক কীভাবে নির্ধারণ করে তার কতটা ঘুম প্রয়োজন। এই গবেষণা ভবিষ্যতে ঘুমের জৈবিক প্রক্রিয়া বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই কম ঘুমের প্রয়োজন হওয়া আর কাজের চাপ, অনিদ্রা বা অন্য কোনো কারণে কম ঘুমানো এক বিষয় নয়। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত ঘুমের সময় কমিয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

ন্যাচারাল শর্ট স্লিপার কারা?

ন্যাচারাল শর্ট স্লিপার হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি জন্মগতভাবেই অন্যদের তুলনায় কম সময় ঘুমান, কিন্তু ঘুম থেকে উঠে সতেজ অনুভব করেন। দিনের বেলাতেও তাদের অতিরিক্ত ঘুম পায় না এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে কোনো অসুবিধা হয় না।

গবেষকদের মতে, এই ধরনের মানুষের মধ্যে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়-

তারা সাধারণত রাতে চার থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েই সতেজ বোধ করেন।

কম ঘুমানোর এই অভ্যাসটি তাদের জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যমান থাকে।

ছুটির দিনেও তাদের ঘুমের সময় সাধারণত খুব বেশি বেড়ে যায় না।

পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য তাদের অ্যালার্ম বা অতিরিক্ত ক্যাফেইনের ওপর নির্ভর করতে হয় না।

তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও একই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।

তবে কেবল চার বা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়ে দিনের বেলায় ক্লান্তি অনুভব না করলেই কাউকে ন্যাচারাল শর্ট স্লিপার বলা যায় না। ঘুমের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অনেকে নিজের কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক বলে মনে করেন। তাই এই বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে ঘুমের দীর্ঘমেয়াদি ধরন, শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসাবিষয়ক মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কম ঘুমের পেছনে কীভাবে কাজ করে জিন?

ঘুমের সময় ও স্থায়িত্বের ওপর জিনের প্রভাব অপরিসীম। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত কয়েকটি জিনে এমন বিরল পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন, যেগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কম ঘুমের প্রয়োজন হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে অন্তত পাঁচটি জিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো DEC2, ADRB1, NPSR1, GRM1 এবং SIK3। এই জিনগুলো ঘুম ও জেগে থাকার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত।

DEC2 জিন

২০০৯ সালে বিজ্ঞানীরা DEC2 জিনের একটি বিরল পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কম ঘুমের সম্পর্ক শনাক্ত করেন। এই জিন শরীরের ঘুম ও জেগে থাকার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ADRB1 জিন

২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ADRB1 জিনের একটি বিরল পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। গবেষকেরা দেখেছেন, এই পরিবর্তন ঘুম ও জেগে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপকে প্রভাবিত করতে পারে। এ বিষয়ে ইঁদুরের ওপর করা পরীক্ষাও গবেষকদের এই ধারণাকে সমর্থন করেছে।

NPSR1, GRM1 ও SIK3 জিন

গবেষণায় এই জিনগুলোর কিছু বিরল পরিবর্তনের সঙ্গেও কম ঘুমের প্রয়োজনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব জিন ঠিক কীভাবে মানুষের ঘুমের প্রয়োজন কমায়, তার সব দিক এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

গবেষকেরা এখনও বোঝার চেষ্টা করছেন, এই মানুষদের মস্তিষ্ক কি কম সময়েই ঘুমের প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করে ফেলে, নাকি তাদের শরীরের পুনরুদ্ধারের জন্য তুলনামূলক কম ঘুমই যথেষ্ট। তাই বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।

কম ঘুমালেই কি শরীরের ক্ষতি হয় নাকি না?

এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। ন্যাচারাল শর্ট স্লিপারদের বৈশিষ্ট্য দেখে এমন ধারণা করা ঠিক হবে না যে সবাই কম ঘুমিয়ে সুস্থ থাকতে পারবেন।

বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্কের প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের মতো স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ঘুমের ঘাটতি মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, মেজাজ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

অনেকে কাজের চাপ, রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার, অনিয়মিত জীবনযাপন কিংবা ঘুমের সমস্যার কারণে নিয়মিত চার থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমান। তাদের শরীর যে এই কম ঘুমের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, তা ধরে নেওয়া ভুল হবে।

বিশেষজ্ঞদের একটি বড় উদ্বেগ হলো, দীর্ঘদিন কম ঘুমানোর ফলে কেউ কেউ ক্লান্তির অনুভূতি কম বুঝতে পারেন। ফলে নিজেদের কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক মনে হলেও ঘুমের ঘাটতি ভেতরে ভেতরে শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে।

নিজের ঘুমের প্রয়োজন বুঝবেন কীভাবে?

প্রত্যেক মানুষের ঘুমের প্রয়োজন এক নয়। বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক অবস্থা ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের কারণে এর পার্থক্য হতে পারে। তবে নিজের ঘুমের প্রয়োজন বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন:

ঘুমের নির্দিষ্ট সময় রাখুন: প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে উঠুন।

ছুটির দিনে খেয়াল করুন: অ্যালার্ম ছাড়া ঘুমানোর সুযোগ পেলে কতক্ষণ ঘুম হচ্ছে, তা লক্ষ করুন।

দিনের বেলার অবস্থা দেখুন: ঘুম ঘুম ভাব, মনোযোগের অভাব বা কাজে ভুল হচ্ছে কি না, খেয়াল রাখুন।

ক্যাফেইনের ওপর নির্ভরতা বিবেচনা করুন: অতিরিক্ত চা বা কফি খেয়ে জেগে থাকতে হচ্ছে কি না, তা লক্ষ করুন।

সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরামর্শ নিন: পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও ক্লান্ত লাগলে বা রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে ঘুমের প্রয়োজন বোঝার জন্য কয়েক রাত অ্যালার্ম ছাড়া ঘুমানোর পরামর্শের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণ দিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে কেউ ন্যাচারাল শর্ট স্লিপার।

কম ঘুমের অভ্যাস তৈরি করার চেষ্টা কি ঠিক?

না। জিনগতভাবে স্বাভাবিকভাবে কম ঘুমের প্রয়োজন হয় এমন বিরল মানুষদের বৈশিষ্ট্যকে অনুকরণ করে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুম কমানো একদমই উচিত নয়।

কেউ যদি কাজের সময় বাড়ানোর জন্য নিয়মিত ঘুমের সময় কমিয়ে দেন, তাহলে ধীরে ধীরে ঘুমের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ঘুমের সময় কমিয়ে বেশি কাজ করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের সুযোগ রাখা ভালো। কারও যদি নিয়মিত ঘুমাতে অসুবিধা হয়, তাহলে ঘুমের অভ্যাস, মানসিক চাপ, ওষুধের প্রভাব অথবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার বিষয়টি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

কিছু মানুষ জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যদের তুলনায় কম ঘুমিয়েও সতেজ থাকতে পারেন। বিজ্ঞানীরা ন্যাচারাল শর্ট স্লিপারদের নিয়ে গবেষণা করছেন, যাতে ঘুমের প্রয়োজন এবং মস্তিষ্কের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।

তবে এই বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত বিরল। নিয়মিত চার থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন বলে সবার ক্ষেত্রে কম ঘুম নিরাপদ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। তাই নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দিন এবং শুধু বেশি সময় জেগে থাকার জন্য ঘুমের সময় কমিয়ে দেবেন না।