চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ বছরের নোবেল পুরস্কার জয় করেছেন মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক কার্ল ডাইজেরথ। তাঁর জীবনদর্শন, স্মৃতিশক্তি এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বিস্তারিত আলাপচারিতার কথা উঠে এসেছে।

মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতার কিছু অসাধারণ দিক থাকে, যা কার্ল ডাইজেরথের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে শব্দের সঙ্গে তাঁর এক গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। খুব দ্রুত কোনো লেখা পড়ে তা স্মৃতিতে ধরে রাখার এক বিশেষ ক্ষমতা তাঁর। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, "মনে আছে, ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় একটা কবিতা মুখস্থ করার জন্য আমাদের প্রায় ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাত তুলে আমি বলেছিলাম, ‘হয়ে গেছে।’ সামনে গিয়ে যখন কবিতাটি আবৃত্তি করলাম, শিক্ষক চমকে গিয়েছিলেন। নিশ্চয়ই ভাবছিলেন, ‘এটা কীভাবে সম্ভব! ও নিশ্চয়ই কবিতাটা আগে থেকেই জানত।’ তাই পরীক্ষা করার জন্য তিনি আমাকে অন্য একটা কবিতা দিলেন। সেটাও আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মুখস্থ করে ফেলেছিলাম।"

ডাইজেরথের মতে, তিনি শব্দগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে বরং একটি গুচ্ছ আকারে দেখার চেষ্টা করেন। সাধারণ মানুষ যেমন একপলকে একটি শব্দ বা বাক্য পড়ে ফেলে, তিনি ঠিক তেমনি একপলকেই একগুচ্ছ বড় লেখা পড়ে নিতে পারেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় তাঁর অনুভূতির গভীরতাও বড় ভূমিকা পালন করে। তাঁর বিশ্বাস, অনুভূতি হলো স্মৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং স্মৃতি হলো অনুভূতির অংশ। কোনো বিষয় যদি মনে কোনো অনুভূতি তৈরি না করে, তবে তা মনে রাখার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে না। এই অনুভূতিই শব্দগুলোকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে সাহায্য করে বলে তিনি মনে করেন।

মানুষের ভেতরে অনুভূতির জন্ম কোথায় হয়, সেই রহস্য উদঘাটনের চেষ্টাই তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি মনে করেন, মানুষ হিসেবে এটি আমাদের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর একটি—মস্তিষ্ক বস্তুটির ভেতর কীভাবে অনুভূতি তৈরি হয়? উত্তর না পাওয়া এই প্রশ্নটিই তাঁকে আজীবন পরিচালিত করে যাচ্ছে।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি লেখালেখির প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। ছোটবেলা থেকেই তিনি লিখতে শুরু করেন এবং রাইটিং ক্লাবে যোগ দেন। কলেজ জীবনে লেখালেখির কোর্স করার পাশাপাশি গ্র্যাজুয়েট স্কুলেও পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় একটি কমিউনিটি কলেজে লেখালেখির ক্লাস করেছেন তিনি। তাঁর মতে, লেখালেখি তাঁর পুরো জীবনের একটি অংশ এবং অত্যন্ত আগ্রহের জায়গা। জীবনের চরম ব্যস্ততার মাঝেও লেখালেখির জন্য সময় বের করতে হলে বিষয়টিকে গভীরভাবে ভালোবাসতে হয়।

কার্ল ডাইজেরথ মনে করেন, মস্তিষ্ক বিজ্ঞান ও শিল্পের মধ্যে এক বিশেষ যোগসূত্র স্থাপন করে। একটি সুন্দর শব্দ যেমন মানুষের মনে বিশেষ অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, তার সবকিছুই ঘটে কোষের মাধ্যমে। মস্তিষ্ক কোনোভাবে শিল্প ও শব্দকে অনুভূতিতে রূপান্তর করে। তাঁর ভাষায়, এক অর্থে এটাই স্নায়ুবিজ্ঞানের মূল কথা এবং একইসাথে শিল্পেরও মূল কথা।

তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় ‘ইউরেকা’ মুহূর্তটি এসেছিল ২০০৭ সালে। তাঁর একজন পিএইচডি শিক্ষার্থী ইঁদুরের মস্তিষ্কের সেই অংশটি নিয়ে গবেষণা করছিলেন যা হাঁটাচলা নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণার এক পর্যায়ে দেখা গেল, আলো জ্বাললেই ইঁদুরটি নড়াচড়া করছে এবং আলো বন্ধ করলেই থেমে যাচ্ছে। ডাইজেরথ সেই মুহূর্তটিকে অবিশ্বাস্য বলে বর্ণনা করেন। আলো ও উদ্ভিদের ডিএনএ ব্যবহার করে তাঁরা কেবল স্তন্যপায়ী প্রাণীর আচরণ সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হননি, বরং এই একটি পরীক্ষাই অনেক দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ও দ্বিধার জবাব দিয়ে দিয়েছিল।

বিজ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, আদতে বিজ্ঞান হলো সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস, আইন—যেকোনো কিছু আরও গভীরভাবে বোঝার মূল চাবিকাঠি। স্নায়ুবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই কথাটি আরও বেশি প্রযোজ্য। কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নায়ুবিজ্ঞানের গভীর প্রভাব তিনি লক্ষ্য করেছেন। বর্তমানে ডিপ লার্নিং ও মেশিন লার্নিং যে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলছে, তার মূল ভিত্তি হলো স্নায়ুবিজ্ঞান, যা আমাদের চারপাশের জীবনকে বদলে দিচ্ছে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক ও নিউরোসায়েন্স নিয়ে যারা কাজ করতে চান, তারা যেন আরও বেশি ঝুঁকি নেন। তাঁর মতে, বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলে এক ধরনের মুক্তি পাওয়া যায়, কারণ সেখানে নির্দিষ্ট ফলাফল বা নির্দিষ্ট সময়ে সাফল্যের প্রত্যাশা থাকে না। প্রত্যাশার চাপ না থাকলে কাজ করা সহজ হয়। অন্যদিকে, চিরাচরিত পথে হাঁটলে চাপ আরও বেশি থাকে, কারণ সেখানে কাজ শেষ করতে না পারলে তাকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

মানসিকভাবে সুস্থ ও সতেজ থাকার জন্য তিনি বিরতি নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অতিরিক্ত কাজ না করে নিজেকে চাঙা রাখা এবং গভীরভাবে ভাবার জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় আলাদা রাখার পরামর্শ দেন তিনি। জীবনের নানা জরুরি কাজের ভিড়েও প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় রাখা উচিত, যখন কোনো বিষয়ের একদম গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করা যায়।

পরিশেষে তিনি বর্তমান সময়টিকে অনন্য বলে অভিহিত করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, আমরা পৃথিবী এবং নিজেদের সম্পর্কে এমন সব গভীর বিষয় আবিষ্কার করতে যাচ্ছি, যা মানব ইতিহাসের পাতায় কেবল একবারই ঘটবে। এই আবিষ্কার নিয়ে প্রতিটি মানুষের রোমাঞ্চিত হওয়া উচিত, কারণ, "এর মধ্য দিয়ে মানবজাতির যাত্রাপথ চিরতরে বদলে যাবে।" এই প্রক্রিয়ার পেছনের আনন্দ ও সৌন্দর্যকে উপভোগ করার আহ্বান জানান তিনি।

(তথ্যসূত্র: আলোকচিত্রী হারলিন্ডে কোলবেলের ফ্যাসিনেশন অব সায়েন্স বইয়ে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার)