‘ডাকিনি ডাকিনি বলে ডেকে গেল কোন সে ডাকিনী’—এই লাইন দিয়ে শুরু হয়েছে একটি গভীর আবেগঘন কাব্যিক স্রোত, যেখানে কবি নিজেকে ‘জন্মবধির’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তো জন্মবধির, কেবল গর্ভের ওমে জননীর একদা শুনেছিলাম নাড়ির লহরে ডাকে আগত জীবন’। রক্তক্লেদে ভূমিতে লুটিয়ে পড়া শরীরে বাঁক নেই, শ্রুতির আখর নেই, দেখার পলক নেই পাথুরে চোখে। তবুও দূর পারাবার পার হতে হতে মেঘে পরিযায়ীদের কন্ঠে নীরব কীর্তন শোনার অনুভূতি তার মধ্যে জাগে।
ঠোঁটে জ্বলে বেমক্কা চুম্বন, বাতাস আছড় মারে, দক্ষিণ দুয়ারখানা বীরের ছাতার মতো খুলে ঘুমায়েছে কবি। পায়ে পায়ে নদীজল ঢোকে, শিয়রে উজান করে গান, উরুতে ভাটির টান। হৃদয় পঙ্কিল, নাভিসরোবরে ওষ্ঠ যেন পদ্মের ভাসান। তর্জনী যেদিকে উঁচু হয়, সেদিকেই গলে পড়ে মৌন ইমারত। ইটের ভগ্নস্তূপের পরে দাঁড়ায়েছে কাল–মহাকাল। তবু প্রশ্ন ওঠে—‘ডাকিনি, ডাকিনি!’ কেন তবে ঝড়ের মাতম নৈঃশব্দ্য মঞ্জরে? ধ্বনির ফুলকি জ্বেলে মৌন পথ বেয়ে চলে ত্রস্ত নিশীথিনী।
কবি বিশ্বাস করেন, ‘তুমি তবে অশরীরী বুকে নিয়ে ফেরি করো আমার প্রেতকালের জীবনপঞ্জিকা’। ‘তুমি তো ডাকিনী, উঁচা উঁচা দাঁতে লেগে আছে কালের মাংসদলা, মুহূর্তের টুঁটি চেপে ভাষার পিঞ্জরে লাগায়েছ হাহাকার উজালা বিপ্লব’। ‘তোমারই সন্ধির মূলে ঘুম যায় চৈতন্য নিথর’, ‘কোনো এক দৈত্য এসে দাঁতে ক্ষতে এঁকে চলে মুগ্ধ জাগরণ’, ‘ঘুম যায় জাগর কপোত’। ছিন্ন কপোতীর রক্তফোঁটা করতলে মাখা, মা নিষাদ মা নিষাদ বলে কোন আর্তনাদে অরণ্য দ্বিখণ্ড হয়, হৃদয়বিচূর্ণ রক্তপুষ্পলতা দোলে বৃক্ষশাখায় শাখায়।
কে ডাকে নিকটে যেতে, পদরেখা উল্টো হয়ে আছে। এত কাঁটা বিছায়েছে কোন সে মালিনী? আমাকে বাগান দাও, যেন এক বিষপুষ্পঝাড়ে সাপের মতন ফণা তুলে রচিব অনন্ত দংশন। ছলধরা আপন ভাগ্যের গায়ে, চন্দ্রঘোর লাগা নিশাতলে নীল নীল শিরা যেন ফুলে ওঠে! বমি আসে, কেন বমি আসে! খামচে মরণমাটি উজায় কাহার চিত্কার!
‘আমি তো আজন্ম বোবা, যে কথা বলার, তা-ই বলতে পারিনি’। অনর্থ শব্দের কল্পদূত আমারে কেবল বলায়েছে চাবুকের শঙ্কা জাগিয়ে। অর্থহীন বাক্যরাশি, নিশিদিন, কত গান, সাজানো প্রলাপ। কই তবে খুলেছে কপাট, পিঞ্জরের ডালা ভেঙে? কোন পাখি খুঁজে পেল নিরুদ্দেশ যাত্রার উড়াল? বোবা আমি কথা বলি নাই, প্রহসনধ্বনির উদগারে শ্বাসবন্ধ আমারে কি বাঁচাতে এসেছ তুমি?
ভোর হয় নাই, তোমারই পায়ের লালিমা মেখেছ বুঝি মুখচোরা দিগন্তের গায়ে, সেখানে অচিন স্বরে আপনাতে লুকায় কেবলি এক নটিনী ডাকিনী। প্রশ্নতির মুখে পুরে নিয়ে আধফোটা কণ্ঠে বলে—‘ডাকিনি ডাকিনি!’ কে তবে দিয়েছে ডাক! সব শ্রুতি মিলাল ইথারে। শুধু সে ধ্বনির বাণ ঢুকে পড়ে নিশ্চল পাথরবুকে জগতের এখান–সেখানে। চেতনা লুটায়, আহাজারি করে বনবৃক্ষলতা। পড়বে বুঝি বা হিম, নয়তো দারুণ খরা, অথবা বানের জলে ভেসে যাবে রোদের প্রাচীর।
‘আমি তো শুনি না কিছু বিপন্ন বধির’। ‘আমারই বুকের থেকে কেড়ে নেয়া লাখ লাখ সন্তানের কান্না আমি শুনতে পাইনি’। সহসা ঝড়ো বাতাস ফিসফিসিয়ে কী কথা বলেছে জাম-পারুলের কানে কানে। অঝোরে ঝরেছে যে বকুল, তার বুকে কোন দুঃখ লিখে চলেনি শব্দ–কবিতা। তাই আমি শুনব ভেবেছি, বুকের পাঁজরে পেরেক ঠুকতে ঠুকতে নিঠুর ফেলে গেল কোন পিশাচিনী। বলে ফের—‘ডাকিনি ডাকিনি!’
রাস্তাজুড়ে ছুটে চলে শবের মিছিল, বোমার কুসুম বোনে দুরন্ত কিশোর। ঘামার্ত গ্রীবায় এসে চুমু খায় সহসা বৃষ্টির ফোঁটা। ভিজে যেতে যেতে আমি কেবল তাহারে খুঁজি নিজের বক্ষের পানে। লোমে লোমে গাঁথা হয় মৃত্যুমতী কামিনীর নখপঙক্তিমালা। দরজা খোলেনি কেউ, কার ডাক উন্মাতাল বোশেখহাওয়ার মতো, কে খুলবে মনোবাতায়ন? চৌদিকে জেগেছে কথা, নিনাদ, প্রলাপ। বোবা আমি পড়ে থাকি, কণ্ঠজুড়ে বিষ ঢালে অজানা অহেতু সাপ। ঘুমে যেন তলিয়ে যাবই!
সহসা কে ডাক দিল! শ্রুতির অতলে চুপি পড়ে ছিল নুড়িখানা, যেন হীরার মতন দ্যুতি ছড়াতে ছড়াতে কথা হতে ভাষা হতে চায়। জানায় ব্যাকুল ফরিয়াদ মরাজলে ঢেউ তুলে তুলে। খাঁ খাঁ ভূমি, উথাল আকাশ, আমি একা, তুমি একাকিনী। ডাক দিতে দিতে হায় সে ডাকিনী বলে যায়—‘ডাকিনি! ডাকিনি!’