রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালির উজোবাজার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী গোলাগুলি চলছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এই সংঘাত শুরু হয়। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রতিবেদনটি লেখা চলাকালীন ওই এলাকায় গোলাগুলি অব্যাহত ছিল।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব মুক্তকণ্ঠকে এই পরিস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “দুপুর সাড়ে ১২টার দিকেও একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলি চলছে। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।”

এই উত্তেজনার মাঝেই সাজেক ভ্যালি থেকে ফেরার পথে প্রায় দুই হাজার পর্যটক চরম সংকটে পড়েছিলেন। আজ সকাল ৯টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের বিশেষ পাহারায় তাঁরা সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। তবে আঞ্চলিক দুটি সংগঠনের ডাকা অবরোধের কারণে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাঁরা উজোবাজার এলাকায় আটকা পড়েন।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী আজ সকালে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়ছিলেন। কিন্তু সাজেক থেকে বের হওয়ার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই বাঘাইছড়ির উজোবাজারে তাঁরা অবরোধকারীদের মুখোমুখি হন। অবরোধকারীরা ওই এলাকায় অবস্থান নেওয়ায় পর্যটকদের গাড়িগুলো সামনে এগোতে পারছিল না। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাঠিপেটা করলে অবরোধকারীরা এলাকা ছেড়ে চলে যান। এরপর বেলা ১১টার দিকে পর্যটকদের গাড়িবহর উজোবাজার এলাকা অতিক্রম করে। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনার ঠিক পরেই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোলাগুলি শুরু হয়।

উল্লেখ্য, গতকাল বুধবার সাজেক পর্যটন সড়কে তৃতীয়বারের মতো অবরোধের ঘোষণা দেয় সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামের দুটি সংগঠন। এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠন দুটি জানায়, আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই অবরোধ চলবে। সেই কারণে গতকালকের মধ্যেই সব পর্যটককে সাজেক ছেড়ে চলে আসার অনুরোধ জানানো হয়।

আঞ্চলিক এই সংগঠনগুলোর ডাকা অবরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাজেক বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় জেলা প্রশাসন। গতকাল সন্ধ্যায় এক গণবিজ্ঞপ্তিতে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে আজ বিকেল চারটার মধ্যে সবাইকে নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসনের এই নির্দেশনা মেনে পর্যটকেরা আজ সকালে সাজেক ছাড়ার চেষ্টা করেন। তবে বের হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁরা উজোবাজারে অবরোধের মুখে পড়েন। সাজেকে পর্যটকবাহী যানবাহনের লাইনম্যান মো. ইয়াসিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অন্যদিন সাজেক থেকে পর্যটকবাহী যান সাড়ে ১০টায় খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। কিন্তু অবরোধের কারণে আজ ছেড়েছে সকাল ৯টায়। সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যদের পাহারায় প্রায় দুই হাজার পর্যটক সাজেক ছেড়েছেন।”

অবরোধের কারণে পর্যটকদের দ্রুত সাজেক ছাড়তে হচ্ছে। অনেক পর্যটক তাঁদের রিসোর্টের আগাম বুকিং বাতিল করেছেন। সাজেকে সড়ক অবরোধের ফলে শুধু পর্যটক বা ব্যবসায়ীরাই নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

এর আগে ১৫ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে দ্বিতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেছিলেন সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও গাছের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

অবরোধকারীদের তিন দফা দাবির মধ্যে অন্যতম হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। ১১ অক্টোবর একই দাবিতে তাঁরা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দিয়েছিলেন।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে জেএসএস। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।”

অবরোধ এবং পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের ঘোষণায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা। সাজেক রিসোর্ট কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অবরোধের কারণে পর্যটকদের সাজেক ছাড়তে হচ্ছে। অনেকে রিসোর্টের আগাম বুকিং বাতিল করেছেন পর্যটকেরা। সাজেকে সড়ক অবরোধ হলে শুধু পর্যটক বা ব্যবসায়ীরা নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম ভোগান্তিতে পড়েন। খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটা ও উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।”