রাঙামাটির সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের ভ্রমণে জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা জারি থাকার মধ্যেই পুনরায় সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন দুটি আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা। এই পরিস্থিতির কারণে পর্যটন খাতের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে দুর্গাপূজার ছুটির সময়ে রিসোর্ট ও কটেজগুলোর বুকিং বাতিল হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, দুর্গাপূজার ছুটি উপলক্ষে আগামী শুক্রবার থেকে চলতি মাসের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজে শতভাগ বুকিং ছিল। তবে প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর অবরোধের আহ্বানের পরপরই পর্যটকেরা তাদের বুকিং বাতিল করতে শুরু করেছেন।
সাজেক জুমঘর রিসোর্টের ব্যবস্থাপক লিগা রায় ত্রিপুরা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পর সাজেক এখন পর্যটকশূন্য। পূজার ছুটিতে আমাদের রিসোর্টের সব রুম বুকিং ছিল। কিন্তু এখন সবাই বুকিং বাতিল করছেন। ব্যবসার মূল মৌসুমে আমাদের বিপুল লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।’
একই রকম সংকটের কথা জানান সাজেক খোয়াল বুক রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সমিরন চাকমা। তিনি জানান, তাঁদের পুরো রিসোর্টটি বুকিং ছিল, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ফলে পর্যটকেরা বুকিং বাতিল করছেন। এর ফলে তাঁদের রিসোর্ট থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বুকিং ফি ফেরত দিতে হচ্ছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, সাজেকের পর্যটনের সঙ্গে অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ মানুষ জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়েছেন। দ্রুত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে সংকট কেটে যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই দ্রুত পর্যটনকেন্দ্রটি খুলে দেওয়া হবে।”
এর আগে গত রোববার সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি নামের দুটি সংগঠন সাজেকে অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে। সংগঠন দুটির অভিযোগ, ওই এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করেছে আঞ্চলিক দল জেএসএস (সন্তু লারমা)। দলটি স্থানীয় জনসাধারণকে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সমাবেশ করে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তবু ব্যবস্থা না নেওয়ায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।
তবে জেএসএসের দাবি, স্থানীয় জনসাধারণকে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁদের মতে, ইউপিডিএফের চাপে পড়ে এই সড়ক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠন দুটি। জেএসএসের প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সাজেকে নিরীহ জনগণের ওপর দীর্ঘদিন ধরে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের যে নিপীড়ন ও হয়রানি চলছে, সেসব আড়াল করতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
অবরোধের কারণে গত রোববার পর্যটকবাহী যানবাহনগুলো সাজেক এলাকায় আটকা পড়েছিল। এরপর ওই দিন সন্ধ্যায় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সাজেক বন্ধ ঘোষণা করে।
প্রশাসনের আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে সাজেকে পুনরায় সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। আজ বুধবার দুই সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। বিবৃতিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা স্বাক্ষর করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাজেকের মাচলঙ এলাকায় জেএসএস (সন্তু লারমা) গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে ১১ অক্টোবর সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ করা হয়েছিল। তখন প্রশাসন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলে অবরোধ স্থগিত করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও দাবি পূরণ হয়নি। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা মাচলঙ এলাকার থালকুম্ভো, চিল্ল্যাতুলি, নোয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভুয়োছড়িতে প্রকাশ্যে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং সাধারণ গ্রামবাসীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ চলবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, খাগড়াছড়িতে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা। আজ বুধবার সকালে খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বরে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দুই আঞ্চলিক সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করায় পাহাড়ের পর্যটন অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
মানববন্ধনে যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, সাজেকের পর্যটন খাতের সঙ্গে অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান জড়িত। তাঁরা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। এক দিন কাজ না থাকলে পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পর্যটনকেন্দ্রটি দ্রুত খুলে দেওয়া প্রয়োজন।
জেলা কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা না করে যখন-তখন পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যবসা গড়ে তুলতে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও বিনিয়োগ থাকে। তাঁদের অনেকেই ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। পর্যটনকেন্দ্র দ্রুত খুলে দেওয়া না হলে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন। প্রয়োজনে হরতাল ও বড় সমাবেশের মতো কর্মসূচিও পালন করা হবে।
ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ইটাব) সদস্য উজ্জ্বল দে বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে সাজেকের বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে আগাম বুকিং ছিল। ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকেরা সেখানে যেতে না পারলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক খুলে দেওয়া না হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।