কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। আজ রোববার সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত কমিটির সদস্যরা বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করেন। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে পুড়ে যাওয়া রিসোর্ট ভবনটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঘুরে দেখেন কমিটির সদস্যরা।
গত শনিবার সকালে কাঠের তৈরি তিনতলা এই রিসোর্টটিতে হঠাৎ আগুন ধরে যায়। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ছয়জন দগ্ধ হয়েছেন। ঘটনার পরপরই গতকাল জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তদন্ত দলের সদস্যরা ১০ জনের মৃত্যু এবং আগুনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই জটিল তদন্ত শেষ করতে পাঁচ কার্যদিবসের বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার আলোকে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধি। আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কমিটিকে।
আজ রোববার দুপুর দুইটা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করেন তদন্ত দলের সদস্যরা। পরিদর্শন শেষে তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান বলেন, “ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আমরা আগুন লাগার কারণ, পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও নথিপত্র ছিল কি না এবং অবকাঠামোগত কী কী সমস্যা ছিল তা খতিয়ে দেখেছি। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন। যত দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”
এই বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আজ রোববার থেকে তদন্ত দল কাজ শুরু করেছেন। দলের সদস্যরা ১০ জনের মৃত্যু ও আগুনের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তদন্তের জন্য পাঁচ কার্যদিবসের বেশি সময়ও লাগতে পারে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এর আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশ, হাসপাতাল ও জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ জানান, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হলেও এই মুহূর্তে কার লাশ কোনটি তা শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ আগুনে পুড়ে তাঁদের শরীর মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার পর তবেই নিশ্চিত হওয়া যাবে কার লাশ কোনটি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টের ভেতরে এক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো রিসোর্টে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় থাকা নারী-পুরুষেরা আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করতে থাকেন এবং ছোটাছুটি শুরু করেন। চরম আতঙ্কে কয়েকজনকে দ্বিতীয়তলা থেকে নিচে লাফিয়ে পড়তে দেখা যায়।
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জনকে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। দগ্ধরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। এদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শনিবার বিকেলে উড়োজাহাজে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বাকি দুজন প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে স্বেচ্ছায় ছাড়পত্র নিয়ে ঢাকায় ফিরে গেছেন।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার রাতে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে রিসোর্টের অন্যতম মালিক মো. তানভীরকে। উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে এই মামলাটি করেন।
ওসি আতিকুর রহমান আরও জানান, মামলায় চারজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর ও নেওয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে গতকাল বিকেলে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় এবং তাঁকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টের অভ্যন্তরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় থাকা পর্যটকদের আর্তনাদ ও ছোটাছুটি দেখা যায়। সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালিত হচ্ছিল। তিনি বলেন, রিসোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন প্রয়োজন, কিন্তু রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনো আবেদনই করেনি।
মেরিন ড্রাইভের পূর্বপাশে ২০ শতক জমির ওপর এই তিনতলা রিসোর্ট ভবনটি নির্মিত হয়েছিল। ভবনের চারপাশের দেয়াল ইট-পাথরের হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় তলার মেঝে ছিল কাঠের পাটাতনের। নিচতলা থেকে ওপরে ওঠার সিঁড়িতেও লোহার ফ্রেমে কাঠের তক্তা ব্যবহার করা হয়েছিল। তিন তলার ছাদটি ছিল টিনের। ভবনের পশ্চিম অংশে বর্ধিত কাঠের ঘরে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালিত হতো, যা মূলত গাছের খুঁটির ওপর তৈরি। এই খুঁটিগুলোর বেশির ভাগই ছিল ঝাউ ও আকাশমণি গাছ। তিন বছর আগে স্থানীয় এক নারীর কাছ থেকে ২০ শতক জমি কিনে এই রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়।
রিসোর্টের আগুনের লেলিহান শিখায় উত্তর পাশে অবস্থিত একটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন (৪০) জানান, আগুনের কারণে তাঁর চা-কফির দোকানের একটি ফ্রিজ ও কাঠের কিছু অংশ পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, সকাল সাতটার দিকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং পর্যটকদের কান্নাকাটি ও ছোটাছুটি দেখতে পান। আগুনের তীব্রতা ও ধোঁয়ার কারণে ভেতরে ঢুকে লোক উদ্ধার করা সম্ভব ছিল না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানান, রিসোর্টটি তৈরির ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং সেখানে কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও ছিল না।