প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক গ্রাম। পশ্চিমে নীল বঙ্গোপসাগর আর পূর্বে সবুজে ঘেরা এই গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ। পাথুরে সৈকত ও প্রাকৃতিক আকর্ষণ এই এলাকাটিকে পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে। এই এলাকারই চরাখাল সেতু সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতক জমিতে চার বছর আগে গড়ে তোলা হয়েছিল টুপটুপ রিসোর্ট। তবে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার পর জানা গেছে, রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিস কিংবা কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না।

কাঠের তৈরি এই রিসোর্টের কক্ষগুলোতে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে আনন্দ-উল্লাস শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন পর্যটকেরা। কিন্তু পরদিন শনিবার সকালে আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নেয় ১০ জনের প্রাণ। আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় তাদের দেহ।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। স্থাপনাটি সম্পূর্ণ কাঠের হওয়ায় আগুন অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে কেউ কেউ বাইরে বেরিয়ে আসতে পারলেও অনেকে ভেতরেই আটকা পড়েন। কয়েক ঘণ্টার দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পর একে একে উদ্ধার করা হয় ১০ জনের মরদেহ। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। এত বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং তদারকির অভাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা তানভির আহমেদ ও মোহাম্মদ নেওয়াজ এই রিসোর্টটির মালিক। ঘটনার পর থেকেই তারা পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।

ঘটনাস্থলে যা দেখা গেল

কক্সবাজারের কলাতলী মোড় থেকে পাটুয়ারটেকের দূরত্ব প্রায় ৫৪ কিলোমিটার। শনিবার বেলা ১১টার দিকে মেরিন ড্রাইভ ধরে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী পেরিয়ে পাটুয়ারটেক এলাকায় পৌঁছাতেই দেখা যায় মানুষের ভিড়। আগের রাতে যে রিসোর্টটি বাহারি আলোয় ঝলমল করছিল, তা তখন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুড়ে যাওয়া আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম। পোড়া কক্ষের ভেতর থেকে তখনও ধোঁয়া উড়ছিল। ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা উদ্ধারকাজ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত ছিলেন।

সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করে এবং সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর শুরু হয় নিখোঁজদের তল্লাশি। এই উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা যোগ দেন।

রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমন আগুন লাগার পর জানিয়েছিলেন, সেখানে মোট ১৮ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তার প্রাথমিক ধারণা ছিল, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।

তবে বেলা ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “আগুনের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। এরপর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”

দুপুর সোয়া ২টার দিকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং বিকেল ৫টার দিকে মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

উদ্ধার অভিযান শেষে উখিয়ার সহকারী কমিশনার আবু আবদুল্লাহ জানান, দুজন পর্যটক সকালে হাঁটতে বের হওয়ায় তারা নিরাপদে ছিলেন। উদ্ধার করা ১০ জনের মরদেহের অবস্থা এমন ছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

আশিকের স্বজন হারানোর বিভীষিকা

ফরিদপুরের কুমারখালী এলাকার বাসিন্দা আশিকুল ইসলাম আশিক ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় থাকতেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বৃহস্পতিবার তিনি টুপটুপ রিসোর্টে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের মোট ৯ জন সদস্য।

দুপুর আড়াইটার দিকে আশিকুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে কথা হলে তিনি বলেন, “আগুন লাগার আগে আমরা দুজন সৈকতে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর রিসোর্টের পেছনের দিকের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে বাইরে বের হতে সক্ষম হই। আমার পরিবারের ছয়জন নিখোঁজ আছে।”

পরবর্তীতে উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে তার স্ত্রী ও শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয়জনকে পাওয়া যায়।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে নিহতদের মধ্যে ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), ফায়িজান আহম্মেদ (৫) ও আশুলিয়ার নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৮)-এর পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতদের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে স্বজনদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। বাকি মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।

‘এমন ঘটনা জীবনে দেখিনি’

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক মানুষ চরাখাল সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কারও চোখেমুখে ছিল আতঙ্ক, কারও কণ্ঠে ক্ষোভ, আবার কেউ প্রকাশ করছিলেন গভীর সমবেদনা।

স্থানীয় বাসিন্দা সালামত উল্লাহ (৭৯) বলেন, “এখানে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন দরকার। প্রতিদিন রাতে ও দিনে টহল দিতে হবে। এত মানুষ মারা গেল, খুব খারাপ লাগছে।”

তার সঙ্গে কথা বলার সময় এগিয়ে আসেন আরেক বাসিন্দা নুর ইসলাম (৬৮)। তিনি বলেন, “জীবনে এমন ঘটনা দেখিনি। এই এলাকায় আগে কখনো এ রকম ঘটনা ঘটেনি। খুব আফসোস লাগছে। সরকারকে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।”

রিসোর্টের পূর্ব পাশে নিজের জমিতে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা হাজী নুরুল ইসলাম জানান, চার বছর আগে সেখানে কাঠ দিয়ে রেস্তোরাঁ তৈরি করা হয়েছিল এবং পরে তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। জমি নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, রিসোর্টের ময়লা-আবর্জনা তার জমিতে ফেলা হতো এবং নিষেধ করলেও তা মানা হয়নি।

রিসোর্টের পূর্বপাশেই গিয়াস উদ্দিনের বসতবাড়ি। শনিবার সকালে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। স্ত্রীর ডাকে বাইরে বেরিয়ে তিনি আগুন দেখতে পান।

গিয়াস উদ্দিন বলেন, “আমার স্ত্রী বলল, বাইরে কীসের আওয়াজ হচ্ছে, একটু দেখো। তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে দেখি টুপটুপ রিসোর্টে আগুন জ্বলছে। পরে বিকল্প রাস্তা দিয়ে গিয়ে দেখি, আমার দোকানেও আগুন লেগেছে। কাছে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। এলাকার মানুষ চেষ্টা করছিল।”

গিয়াস উদ্দিন জানান, আগে সেখানে রেস্তোরাঁ ছিল এবং প্রায় এক বছর ধরে রিসোর্ট হিসেবে চালানো হচ্ছিল। আগুনের পর কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীদের কাউকে তিনি দেখতে পাননি।

উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তদন্ত কমিটি আগুনের সূত্রপাত, কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং রিসোর্টটির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে। এ এলাকায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে।”

তদন্ত কমিটি ও ম্যানেজার আটক

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। এই কমিটি আগুনের সূত্রপাত, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সম্ভাব্য গাফিলতি এবং রিসোর্টটির অনুমোদন সংক্রান্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।

এই ঘটনায় রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুমনকে থানায় রাখা হয়েছে এবং বিস্তারিত পরে জানানো হবে।

লাইসেন্সহীন ছিল রিসোর্টটি

অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। আগে সতর্ক করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বৈধতা নেয়নি।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনও মুক্তকণ্ঠকে জানান, রিসোর্টটির কউকের অনুমোদন ছিল না। মেরিন ড্রাইভ এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই চলছে এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।