‘ওরা খুব সুখী ছিল। একদম ফুলের মতো। ওদের দিকে তাকালে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করবে শুধু,’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্কুলশিক্ষক ফারজানা মতিন। ছোট বোন, বোনজামাই এবং দুই ভাগনির কথা স্মরণ করে বারবার কথা হারিয়ে ফেলছিলেন তিনি।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে অবস্থিত কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ হয়ে আছেন চারজন। তাঁদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাননি স্বজনেরা।
সাতক্ষীরার বাসিন্দা ফারজানা মতিনের ছোট বোন আফসানা মতিন তানজি (৩৬), বোনজামাই নাহিদুর রহমান (৪১) এবং তাঁদের দুই কন্যা রুজাইনা ইনায়া (৬) ও সুনাইনা ইহানা (৩) ওই রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ। পরিবারের সদস্যরা তাঁদের মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন। তবে গতকাল শনিবার রাত পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
গতকাল সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। এই দুর্ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের স্বজনদের সাথে কথা বলে প্রাথমিকভাবে আটজনের পরিচয় অনুমান করা সম্ভব হয়েছে, যাদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য। তবে ওই আটজনের তালিকায় আফসানা, নাহিদ ও তাঁদের দুই মেয়ের নাম নেই।
নাহিদুর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী আফসানা মতিন ও দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরে বসবাস করতেন।
কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির আজ রোববার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কারোর পরিচয়ই আসলে নিশ্চিত হয়নি। ডিএনএ টেস্টের আগে সেটা সম্ভবও নয়। যাদের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো পরিবারের দাবি। সবার পরিচয় নিশ্চিত হতে কিছুটা সময় লাগবে।’
গতকাল রাতে মুঠোফোনে ফারজানা মতিন মুক্তকণ্ঠকে জানান, গতকাল দুপুরের দিকে ফেসবুকে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবরটি তাঁর নজরে আসে। খবরের বিবরণের সাথে ছোট বোনের পরিবারের ভ্রমণের তথ্যের মিল থাকায় তাঁর মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। এর আগেই সকাল সাতটার পর থেকে নাহিদ ও আফসানার মুঠোফোন বন্ধ পাচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
ফারজানা আরও বলেন, ‘আমার বোনজামাই তো মোবাইল বন্ধ রাখে না। ও অফিসের কাজে গেলেও ফোন বন্ধ রাখার ছেলে নয়। সকাল সাতটা থেকে দুজনের ফোন বন্ধ। তখন থেকেই আমার মনে হচ্ছিল, ওরা কোনো বিপদে পড়েছে।’
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘কারোর পরিচয়ই আসলে নিশ্চিত হয়নি। ডিএনএ টেস্টের আগে সেটা সম্ভবও নয়। যাদের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো পরিবারের দাবি। সবার পরিচয় নিশ্চিত হতে কিছুটা সময় লাগবে।’
শুরুতে পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, হয়তো বেড়াতে গিয়ে কোনো কারণে ব্যস্ত আছেন নাহিদ ও আফসানা। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর তাঁদের উদ্বেগ বহুগুণ বেড়ে যায়। ফারজানা দ্রুত আত্মীয়স্বজন এবং কক্সবাজারে পরিচিতজনদের সাথে যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নেওয়া হয় এবং আহত ও নিহতদের তালিকায় চারজনের নাম খোঁজা হয়। তবে কোথাও তাঁদের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
পরবর্তীতে ইন্টারনেটে রিসোর্টের নথিপত্র থেকে নাহিদুর রহমানের নাম ও মুঠোফোন নম্বরের তথ্য পান তাঁদের বন্ধুরা। সেই তথ্য ফারজানার কাছেও পাঠানো হয়। রিসোর্টে তাঁদের অবস্থানের প্রমাণ মিললেও চারজনের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফারজানা জানান, খবর পাওয়ার পর তাঁদের পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। নাহিদের ভাই ও বন্ধুরাও সেখানে যাচ্ছেন।
নাহিদুর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে চাকরি করতেন। স্ত্রী আফসানা মতিন ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকতেন তিনি। গত শুক্রবার সকালে কক্সবাজারে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। আফসানা তাঁর মায়ের কাছে রিসোর্টটির বর্ণনা দিয়ে বলেছিলেন, দোতলা কাঠের তৈরি রিসোর্টটির এক বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখা যায়, অন্যটি থেকে পাহাড়। এছাড়া সকালের নাশতায় বুফের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ভ্রমণের আনন্দ ও রিসোর্টের এমন সুন্দর বিবরণ পরিবারের সাথে ভাগ করে নিয়েছিলেন আফসানা। অথচ সেই ভ্রমণের পর এখন আর তাঁর বা পরিবারের অন্য তিন সদস্যের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
কথার মাঝে বারবার দুই ভাগনির কথা মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিলেন ফারজানা। ছয় বছর বয়সী রুজাইনা ইনায়া এবং তিন বছর বয়সী সুনাইনা ইহানার মধ্যেই দুই পরিবারের সব আনন্দ মিশে ছিল।
ফারজানা বলেন, ‘ওরা সকাল-সন্ধ্যা ভিডিও কলে কথা বলত। ওই দুই মেয়েকে নিয়ে আমাদের কত আনন্দ! আমরা তো ওদের নিয়েই বাঁচতাম।’
কথা বলতে বলতে আবারও কেঁদে ফেলেন ফারজানা। দুই শিশুর সাথে ভিডিও কলে কথা বলা এবং তাঁদের হাসিমুখ—সবকিছুই এখন স্মৃতি আর অনিশ্চয়তার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফারজানা বলেন, ‘ওরা কোথায় হারিয়ে গেল। ওদের কি আর ফিরে পাব না?’