রাস্তার সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আসা একটি রিকশার ধাক্কায় আপনার বাইকের বাম্পারটি ভেঙে গেল। অথবা প্রচণ্ড গরমে বাসে বসে আছেন, দ্রুত বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবছেন, অথচ রাস্তায় কোনো যাত্রী না থাকা সত্ত্বেও বাসটি দাঁড়িয়ে আছে; মনে হচ্ছে চালক ইচ্ছে করেই দেরি করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় প্রচণ্ড রাগ অনুভূত হয়। মনে হয় অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়া হোক কিংবা সামনে থাকা মানুষটিকে একটি উচিত শিক্ষা দেওয়া হোক। রাগের বশবর্তী হয়ে আমরা প্রায়ই এমন কিছু কথা বলে ফেলি বা কাজ করে বসি, যা মুহূর্তের উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার পর নিজের কাছেই অত্যন্ত খারাপ মনে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তখন আর সেই কথাগুলো ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাগের মুহূর্তে মস্তিষ্কের যে অংশটি যুক্তি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের সাথে যুক্ত, সেখানে অস্বাভাবিক সক্রিয়তা দেখা দেয়। ফলে রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত ভুল হয় এবং সেই ভুল পরবর্তীতে দীর্ঘ অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (ডেনসন, টি. এফ. ও অন্যান্য, ২০০৯, জার্নাল অব কগনিটিভ নিউরোসায়েন্স , ২১/৪, এমআইটি প্রেস, যুক্তরাষ্ট্র)
সহজ কথায়, রাগের সময় মানুষের বিচারবুদ্ধি সঠিকভাবে কাজ করে না। তাই রাগের মাথায় নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিষয়ে পবিত্র কোরআনে কী বলা হয়েছে, তা আসা যাক।
আল্লাহ-তাআলা মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে, যারা রাগ দমন করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)
এই আয়াতে রাগ দমন বোঝাতে ‘কাজিমিনাল গাইজ’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ‘কাজম’ শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছু ভেতরে চেপে ধরে রাখা। আয়াতে এটি বলা হয়নি যে মুমিনের রাগ হবে না। রাগ হবেই, কারণ এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। তবে সেই রাগকে প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাইরে প্রকাশ করতে দেওয়া যাবে না, বরং ভেতরেই সংবরণ করতে হবে।
এটাই আল্লাহর কাছে প্রিয় বান্দার পরিচয়। যে ব্যক্তি রাগ দমন করতে পারে, সে-ই সৎকর্মশীল। আর এই সৎকর্মশীলতা হলো বেহেশতি মানুষদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১. রাগ দমনকারীই প্রকৃত শক্তিশালী: শারীরিক শক্তির চেয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অপরকে হারিয়ে দেয়। শক্তিশালী সে, যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
সাধারণত আমরা শক্তি বলতে শারীরিক সক্ষমতাকে বুঝি। কিন্তু নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন। যে মানুষ রাগের মুহূর্তে নিজেকে শান্ত রাখতে পারে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চুপ থাকে, সে-ই প্রকৃত বীর।
২. রাগ না করাই শ্রেষ্ঠ উপদেশ: এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে বললেন, ‘আমাকে উপদেশ দিন।’ রাসুল বললেন, ‘রাগ কোরো না।’ লোকটি একই কথা বারবার জিজ্ঞেস করলেন। প্রতিবারই তিনি একই উত্তর দিলেন, ‘রাগ কোরো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৬)
লোকটি হয়তো আশা করেছিলেন নামাজ, রোজা বা দান-সদকা নিয়ে কোনো উপদেশ পাবেন। কিন্তু মহানবী (সা.) তাঁকে জীবনের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষাটি দিলেন। কারণ রাগ এমন একটি অনুভূতি, যা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে জীবনের বাকি সব ভালো কাজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৩. শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন: রাগের তীব্রতা কমাতে শারীরিক অবস্থান বদলানোর পরামর্শ দিয়েছেন রাসুল (সা.)। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও যখন রাগ হয়, আর সে দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে, তখন সে যেন বসে পড়ে। এতে রাগ চলে গেলে ভালো, না গেলে সে যেন শুয়ে পড়ে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৪)
এই উপদেশটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মানুষ সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে। বসে পড়লে বা শুয়ে পড়লে শরীর শান্ত হয় এবং শরীর শান্ত হলে মনও ধীরে ধীরে প্রশান্ত হয়।
৪. জান্নাতের পথ ও রাগ সংবরণ: আল্লাহ সুরা শুরায় বেহেশতিদের গুণাবলি বর্ণনা করে বলেন, ‘যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে এবং রাগান্বিত হয়েও ক্ষমা করে দেয়।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৭)
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, শুধু বড় গুনাহ থেকে বাঁচার কথা বলা হয়নি, বরং রাগের মুহূর্তে ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টিকে একই সারিতে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ রাগ সংবরণ করা কোনো সাধারণ গুণ নয়, এটি জান্নাতিদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
রাসুল (সা.)-এর জীবন থেকে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আনাস (রা.) বলেন, তিনি একবার নবীজির সঙ্গে হাঁটছিলেন। নবীজির গায়ে ছিল মোটা কাপড়ের একটি চাদর। এক বেদুইন এসে সেই চাদর ধরে সজোরে টান দিল। টানের কারণে মোটা কাপড়ের ঘষায় নবীজির কাঁধে দাগ বসে গেল। লোকটি কর্কশ স্বরে বলল, ‘আল্লাহর যে সম্পদ তোমার কাছে আছে, তা থেকে আমাকে কিছু দিতে বলো।’
মহানবী (সা.) লোকটির দিকে ফিরে তাকালেন। মুচকি হাসলেন। তারপর তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৪৯)
শারীরিক ব্যথা এবং রূঢ় আচরণের শিকার হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাগ করেননি বা প্রতিশোধ নেননি। বরং হাসিমুখে সাহায্য করেছেন। এটাই ছিল তাঁর অনন্য চরিত্র। রাসুলের অনুসারী হিসেবে আমাদের মাঝেও এমন আচরণ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পরেরবার যখন আপনার রাগ উঠবে, তখন একটি কাজ করুন—থেমে যান। কথা বলার আগে অন্তত তিন সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। প্রয়োজনে বসে পড়ুন অথবা জায়গা পরিবর্তন করুন। রাগের মুহূর্তে আপনি যা বলবেন বা করবেন, তার দায়ভার পরবর্তীতে আপনাকেই বহন করতে হবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নবীজির দেখানো পথে হাঁটলে আপনি এমন অনেক ভুল থেকে বেঁচে যাবেন, যার জন্য হয়তো সারা জীবন আফসোস করতে হতো।
—মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।