মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন চারপাশের পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল হয়ে দাঁড়ায়। অনেক চেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রমের পরেও যখন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ধরা দেয় না, তখন অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং জীবনকে অর্থহীন মনে করতে শুরু করেন। এই মানসিক অবস্থাই মানুষকে গভীর হতাশার দিকে ঠেলে দেয়।
তবে ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মুমিনের জীবনে হতাশার কোনো স্থান নেই। পরিস্থিতি যত জটিল বা কঠিনই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই জীবনের সমস্ত দৃশ্যপট বদলে দিতে পারেন।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে এমন কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা একজন বিপর্যস্ত মানুষকে নতুন করে আশাবাদী হতে সাহায্য করে। মুমিনের জীবন থেকে হতাশা দূর করার সাতটি কার্যকর নির্দেশনা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. কষ্টকে চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে না দেখা
দুঃসময়ে মানুষ সাধারণত একটি বড় ভুল করে থাকে; তারা বর্তমানের কষ্টকে ভবিষ্যতের চিরস্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে ধরে নেয়। মনে করা হয় যে, আজ যে সুযোগের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, তা আগামীকালেও বন্ধই থাকবে। এই নেতিবাচক ধারণা ধীরে ধীরে মানুষের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি কমিয়ে দেয়।
আসলে জীবনের কোনো অবস্থাই স্থায়ী নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫)
উল্লেখ্য যে, পরবর্তী আয়াতেও একই কথা পুনরায় বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন যে, কষ্টের আড়ালেই স্বস্তি অপেক্ষা করছে এবং অন্ধকারের পর আলোর উদয় হবেই। তাই কঠিন সময়কে জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত মনে না করে ধৈর্য ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়াই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
২. আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা
হতাশার মুহূর্তে আল্লাহর সাহায্যই মুমিনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। নিজের সীমাবদ্ধতা বা অক্ষমতার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস না ফেলে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার ওপর ভরসা করা জরুরি।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করবে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেবেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)
দোয়ার ফল কখনো দ্রুত পাওয়া যায়, আবার কখনো তা পেতে বিলম্ব হয়। অনেক সময় মানুষ যা চায় তা-ই পায়, আবার কখনো তার চেয়েও অধিক কল্যাণকর কিছু তার জন্য নির্ধারিত থাকে। যে পথে কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, আল্লাহ সেখান থেকেও পথ বের করে দিতে পারেন। তাই পরিস্থিতি যাই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে আশাহত হওয়া যাবে না।
৩. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া
অনেকে অতীতের ব্যর্থতা এবং ভুলের স্মৃতি বয়ে বেড়ান, যা তাদের বর্তমান জীবনকেও বিষণ্ন করে তোলে। ইসলাম মানুষকে এমন নিরাশার অন্ধকারে ডুবে থাকতে নিষেধ করেছে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
মানুষের পক্ষে অতীত মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তবে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই যা হয়ে গেছে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। অতীতকে আঁকড়ে ধরে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
৪. আন্তরিকভাবে দোয়া করা
জীবনের অনেক পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। তাই সবক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। এটি বান্দার সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ককে আরও মজবুত করে।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা মুমিন, আয়াত: ৬০)
দোয়ার ফলাফল কখনো দ্রুত আসে, কখনো আসে বিলম্বে। কখনো মানুষ যা চায় তা-ই পায়, আবার কখনো তার চেয়েও কল্যাণকর কিছু তার জন্য নির্ধারিত থাকে। তাই ফলাফল আসতে দেরি হওয়া মানেই এই নয় যে দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
৫. প্রাপ্ত নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
মানুষের স্বভাব হলো যা নেই তার প্রতি বেশি আগ্রহী হওয়া। ফলে প্রাপ্তির দিকে নজর না দিয়ে অপ্রাপ্তির কথা ভাবলে হাতের কাছের অসংখ্য নেয়ামতকেও তুচ্ছ মনে হয়।
অথচ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৪)
এই অগণিত নেয়ামতের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে মানসিক প্রশান্তি আসে এবং নেয়ামত আরও বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি আমার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বেশি দান করব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)
কৃতজ্ঞতা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়, ফলে সে অপ্রাপ্তির জন্য হতাশ হয় না। নেয়ামতের মূল্য উপলব্ধি করতে পারলে জীবনের প্রতি বিরক্তি কমে আসে।
৬. সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া
আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ এই নয় যে হাত গুটিয়ে বসে থাকা। বরং মুমিন তার সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে যেয়ো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
ব্যর্থতার ভয় অনেক সময় মানুষকে চেষ্টা করা থেকে বিরত রাখে। তবে ব্যর্থতা মানেই পথ শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং অনেক সময় ব্যর্থতা মানুষকে ভুল পথ থেকে সরিয়ে সঠিক পথের দিশা দেখায়। তাই ফলাফল অনুকূলে না এলেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৭. একাকীত্বের অনুভূতি দূর করা
হতাশার অন্যতম বড় কারণ হলো নিঃসঙ্গতা। মানুষ নিজেকে একা মনে করলেও মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তার অবস্থা ও অন্তরের খবর সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার ঘাড়ের ধমনির চেয়েও নিকটতর।’ (সুরা কাফ, আয়াত: ১৬)
পৃথিবীর মানুষ না বুঝলেও আল্লাহ জানেন কী কষ্ট নিয়ে সে দিন পার করছে, কত অশ্রু লুকিয়ে রাখছে এবং কত সংগ্রাম করে নিজেকে সামলে রাখছে। এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে ভেতর থেকে সাহসী করে তোলে।
পরিশেষে বলা যায়, হতাশা জীবনে আসতে পারে, কিন্তু তাকে হৃদয়ের স্থায়ী বাসিন্দা হতে দেওয়া যাবে না। রাত যত দীর্ঘই হোক, ভোর তার নিয়মেই আসে। মানুষের দায়িত্ব হলো চেষ্টা করা, দোয়া করা, ভুল থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখা। যে হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখবে, তার কাছে সংকট কখনোই শেষ কথা হয়ে থাকবে না। সীমাহীন হতাশার মধ্যেও সে ধৈর্য ও আশার পথ খুঁজে পাবে।
—নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
[email protected]