আমাদের সামাজিক জীবন ও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতিথি এবং আতিথেয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ইসলাম ধর্মে মেহমানদারি করা এবং অতিথিদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে আতিথেয়তার দায়িত্ব শুধু স্বাগতিকের ওপরই নয়, একজন অতিথিরও কিছু নির্দিষ্ট আদব ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। অন্যের গৃহে অতিথি হিসেবে অবস্থানকালে একজন মুমিনের যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

প্রথমত, কারও বাড়িতে প্রবেশ করার পর অতিথির প্রথম সৌজন্য হওয়া উচিত সালাম প্রদান করা। পবিত্র কোরআনে এই বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ‘অতএব, যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন পরস্পরের প্রতি সালাম করবে।’ (সুরা নূর, আয়াত: ৬১)। সালাম কেবল একটি সাধারণ অভিবাদন নয়, বরং এটি একটি ইবাদত এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। সালাম মানুষের অন্তরে বিনয় ও ভালোবাসা জাগ্রত করে, পারস্পরিক দূরত্ব ঘুচিয়ে সম্পর্ককে আরও সুন্দর ও সৌহার্দ্যময় করে তোলে।

দ্বিতীয়ত, ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত জীবন এবং গোপনীয়তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের কথা বলে। তাই কারও বাড়িতে যাওয়ার আগে অনুমতি নেওয়া এবং সম্ভব হলে আগে থেকে সময় নিশ্চিত করে নেওয়া উত্তম। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কোনো ঘরে প্রবেশ কোরো না, যতক্ষণ না অনুমতি নাও..।’ (সুরা নূর, আয়াত: ২৭)। এমন সময়ে হঠাৎ কারও বাড়িতে উপস্থিত হওয়া উচিত নয়, যখন তার জন্য অতিথি গ্রহণ করা কষ্টকর হতে পারে। বর্তমান যুগে একটি ফোনকল বা খুদে বার্তার মাধ্যমে আগে থেকে সময় নিশ্চিত করে নেওয়া অত্যন্ত সহজ ও সমীচীন।

তৃতীয়ত, মেহমানের উপস্থিতি যেন স্বাগতিকের জন্য আনন্দের উৎস হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনোভাবেই যেন অতিথির অবস্থান স্বাগতিকের জন্য বোঝা বা ক্ষতির কারণ না হয়—এই বিষয়টি সব সময় মনে রাখা জরুরি। ইসলামে অন্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। (দারাকুতনি, ৩/৭৭, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ২০০৪)। মেহমানদারির ক্ষেত্রেও এই মূলনীতি সমানভাবে প্রযোজ্য। নিজের আনন্দ বা সুবিধার জন্য অন্যের মানসিক শান্তি নষ্ট করা একজন মুমিনের কাজ হতে পারে না।

চতুর্থত, স্বাগতিক যখন মেহমানের সামনে খাবার পরিবেশন করেন, তখন তা তাঁর ভালোবাসা ও আতিথেয়তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য হয়। খাবার যত সাধারণই হোক না কেন, তার সাথে জড়িয়ে থাকে স্বাগতিকের আন্তরিকতা। তাই খাবার নিয়ে অযথা প্রত্যাশা করা, অন্য খাবারের সাথে তুলনা করা কিংবা সমালোচনা করা অতিথির জন্য শোভন নয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘নবীজি (সা.) কখনো কোনো খাবারের সমালোচনা করতেন না। কোনো খাবার পছন্দ হলে তিনি তা খেতেন, আর অপছন্দ হলে তা বর্জন করতেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩২৫৫)।

পঞ্চমত, মেহমানদারি যেমন সওয়াবের কাজ, তেমনি অতিথির দায়িত্ব হলো স্বাগতিকের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি না করা। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ সময় অবস্থান করা, স্বাগতিকের ব্যক্তিগত সময় এবং দৈনন্দিন রুটিন ব্যাহত করা অনুচিত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। বিশেষ সমাদর হলো এক দিন এক রাত। আর মেহমানদারি হলো তিন দিন, এরপর যা তা সদকা। আর মেহমানের জন্য বৈধ নয় যে সে তার নিকট থাকবে এবং তাকে কষ্ট দেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৫)। তাই সময়মতো বিদায় নেওয়া স্বাগতিকের প্রতি এক ধরনের সম্মান প্রদর্শন।

ষষ্ঠত, মেহমান হিসেবে কারও বাড়িতে অবস্থান শেষে বিদায়ের সময় স্বাগতিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। তাঁর দেওয়া সময়, শ্রম, যত্ন ও আতিথেয়তার স্বীকৃতি দেওয়া ইসলামি সৌজন্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তোমাদের প্রতি কোনো উপকার করে, তোমরা তাকে তার প্রতিদান দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৭২)। এই প্রতিদান সবসময় বস্তুগত হতে হবে এমন নয়; আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানানো, দোয়া করা বা সুন্দর কথা বলাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। বিদায়ের আগে ‘আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন’—এই ছোট্ট কথাটিও স্বাগতিকের আন্তরিকতার এক সুন্দর স্বীকৃতি হতে পারে।

—রায়হান আল ইমরান : আলেম ও গবেষক