সৌন্দর্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পরিচ্ছন্নতা। একজন মুমিনের দৈনন্দিন জীবনযাপনে এমন অনেক ছোট ছোট আমল বিদ্যমান, যার মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সুন্নাহর সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। নখ কাটা তেমনই একটি আমল, যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও ইসলামে এর স্বতন্ত্র গুরুত্ব রয়েছে। রাসুল (সা.) নখ কাটাকে মানুষের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং এটি দীর্ঘ সময় ফেলে না রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইসলামি পরিভাষায় ‘ফিতরাত’ বলতে মানুষের সৃষ্টিগত মৌলিক স্বভাবকে বোঝায়। নখ কাটা কেবল বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, বরং এটি ফিতরাতেরই অংশ। পাঁচটি বিষয়কে ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে: খতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং গোঁফ ছোট করা।
এই বিষয়ে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয় ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত, খতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং গোঁফ ছোট করা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৯১)
সুতরাং, নখ ছোট ও পরিচ্ছন্ন রাখা ইসলামের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থারই একটি অংশ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষা পায়, তেমনি মুমিনের জীবনে সুন্নাহর চর্চাও অব্যাহত থাকে।
নখ কাটার ক্ষেত্রে ইসলাম একটি সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদের জন্য গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা ও নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চল্লিশ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮)
এখানে চল্লিশ দিনকে নখ বড় রাখার অনুমতি হিসেবে গণ্য করা যাবে না, বরং এটি একটি চূড়ান্ত সীমা। অর্থাৎ, পরিচ্ছন্নতার এই কাজগুলো এত দীর্ঘ সময় অবহেলা করা উচিত নয়। এছাড়া কিছু বর্ণনায় সপ্তাহে একদিন নখ কাটার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (আল–আসকালানি, হিদায়াতুর রুওয়াত ইলা তাখরিজি আহাদিসিল মাসাবিহি ওয়াল মিশকাত, ৪/২৩৫, দারু ইবনিল কাইয়্যিম, দাম্মাম, ২০০১)
অনেকের ধারণা যে, শুধুমাত্র জুমার দিন নখ কাটা সুন্নত। তবে বিষয়টি এতটা নির্দিষ্ট নয়। বিশুদ্ধ হাদিসে রাসুল (সা.) নখ কাটার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন বাধ্যতামূলক করেছেন বলে পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো দিন নখ কাটা যাবে। তবে জুমার দিন মুসলমানদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হওয়ার বিশেষ দিন। গোসল, সুগন্ধি ব্যবহার এবং পরিষ্কার পোশাক পরিধানের মাধ্যমে এই দিনের মর্যাদা প্রকাশ পায়। এই কারণে অনেক আলেম জুমার দিন নখ কাটাকে উত্তম মনে করেছেন। তবে অন্য দিনে নখ কাটলে তা সুন্নাহর পরিপন্থী হবে—এমন কথা বলা সঠিক নয়।
ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো সম্মানজনক ও পরিচ্ছন্নতার কাজগুলো ডান দিক থেকে শুরু করা। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) জুতা পরা, চুল আঁচড়ানো, পবিত্রতা অর্জন এবং তাঁর সব কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দ করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৬৮)
যেহেতু নখ কাটা একটি পরিচ্ছন্নতার কাজ, তাই এটি ডান দিক থেকে শুরু করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। ফকিহগণ নখ কাটার ক্ষেত্রে আঙুলগুলোর একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা উল্লেখ করেছেন। সেই পদ্ধতি অনুযায়ী, প্রথমে ডান হাতের শাহাদাত (তর্জনী) আঙুল থেকে শুরু করে কনিষ্ঠ আঙুল পর্যন্ত, এরপর বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুল থেকে শুরু করে বৃদ্ধাঙ্গুলি পর্যন্ত এবং সবশেষে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ কাটা উত্তম।
পায়ের নখের ক্ষেত্রে প্রথমে ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল থেকে শুরু করে একে একে বাম দিকে অগ্রসর হয়ে বাম পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল পর্যন্ত নখ কাটা উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শারহি সহিহিল বুখারি, ১৮/১৮৪-১৮৫, আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দিমাশক, ২০১৩)
কাটা নখ ফেলার বিষয়ে ইসলামে কোনো কঠোর বিধান নেই। তবে কিছু ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবে কাটা নখ মাটিতে পুঁতে রাখাকে মোস্তাহাব বলা হয়েছে। এর পেছনে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি সম্মান এবং পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। তবে নখ মাটিতে পুঁতে না রেখে ময়লার পাত্রে ফেললেও কোনো পাপ হবে না। তবে নখ ফেলার সময় এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত যাতে তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরিবেশের অপরিচ্ছন্নতা সৃষ্টি না করে। (আল-মুহিতুল বুরহানি ফি ফিকহিন নুমানি, ৮/৮৭, ইদারাতুল কোরআন ওয়াল উলুমিল ইসলামিয়া, করাচি, ২০০৪)
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা