ম্যাচের শুরুটা দেখে শেষ পরিণতির কথা কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। বল হাতে তাসকিন আহমেদের বিধ্বংসী বোলিং আর ব্যাট হাতে তানজিদ হাসান ও সৌম্য সরকারের ঝোড়ো ব্যাটিং—দুই ইনিংসেই দারুণ সূচনা করেছিল বাংলাদেশ। তবে ক্রিকেট কেবল শুরুর লড়াই নয়, বরং শেষ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার খেলা। আর সেখানেই চরম ব্যর্থতা বাংলাদেশের। ফলে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়ে মাঠ ছাড়ল টাইগাররা।

বোলিংয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাসকিন আহমেদের শুরুর ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে পড়ে জিম্বাবুয়ে। প্রথম ৭ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে তারা করে ছিল মাত্র ২৪ রান। এই শুরুর পুরো কৃতিত্ব তাসকিনের, যার বোলিং ফিগার ছিল ৪–১৩–০–৩। কিন্তু মাঝের ওভারগুলোতে ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিনের দেড় শ রানের বিশাল জুটি গড়ার পর সেই জিম্বাবুয়েই শেষ পর্যন্ত ২৭১ রান সংগ্রহ করে ফেলে।

ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে বর্তমান ক্রিকেটে তিন শ রান তাড়া করা খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ২৭২ রানের লক্ষ্যটি খুব বেশি বড় মনে হওয়ার কথা ছিল না। বিশেষ করে তানজিদ হাসান আর সৌম্য সরকারের উদ্বোধনী জুটিতে প্রথম ৬ ওভারে ৪৭ রান তুলে নেওয়ার পর জয়ের সম্ভাবনা প্রবল মনে হচ্ছিল।

কিন্তু এরপরই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ল বাংলাদেশ। এমন এক ধস নামল যে, বাংলাদেশ যেন ব্যাটিং করতে ভুলে গিয়েছিল। মিডল অর্ডারের কোনো ব্যাটসম্যানই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আবুধাবিতে ৯৯ রানে ম্যাচ হেরে যায় বাংলাদেশ।

জিম্বাবুয়ের বোলিং খুব একটা অসাধারণ ছিল না, বরং বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাই একের পর এক উইকেট বিলিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে মাঝের ওভারে যাঁদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল—তাওহিদ হৃদয়, নাজমুল হোসেন আর মোসাদ্দেক হোসেন—তাঁরা তিনজনই বলের লাইন মিস করে এলবিডব্লুই হয়েছেন।

এর বাইরে তানজিদ হাসান আগের বলে জীবন পেয়ে পরের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এবং সৌম্য সরকার ক্যাচ দেন স্লিপে। ব্যাটসম্যানদের এমন ব্যর্থতার পর শেষ দিকে রিশাদ হোসেন আর তাসকিন আহমেদের ২৬ বলে ৩৬ রানের জুটি হারের ব্যবধান কিছুটা কমালেও বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

বোলিংয়েও মাঝের ওভারগুলোতে ভুগেছে বাংলাদেশ। তাসকিনের দুর্দান্ত স্পেল শেষ হতেই স্বস্তি পেতে শুরু করে জিম্বাবুয়ে। দুই বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান ও শরীফুল ইসলাম উইকেট নিতে ব্যর্থ হন। এমনকি মোসাদ্দেক হোসেন ও রিশাদ হোসেনের স্পিনেও কোনো উইকেট আসেনি।

বাংলাদেশের বোলিংয়ের ব্যর্থতার পাশাপাশি কৃতিত্ব দিতে হবে ক্রেইগ আরভিন ও ব্রেন্ডন টেলরকে। তাঁরা অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে রান তুলেছেন এবং রানের গতি সচল রেখেছেন। বাংলাদেশের বোলাররা তাঁদের তেমন কোনো অস্বস্তিতে ফেলতে পারেননি।

৪ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা জিম্বাবুয়েকে এই দুই ব্যাটসম্যানই পথ দেখিয়েছেন। চোটের কারণে সিরিজ থেকে ছিটকে পড়া লিটন দাসের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়া তাওহিদ হৃদয় একের পর এক বোলার পরিবর্তন করেও সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

অবশেষে উপায় না দেখে সপ্তম বোলার হিসেবে সাইফ হাসানকে আক্রমণে আনেন তাওহিদ। আর এই সিদ্ধান্তই হয় বাজিমাত! পরপর দুই ওভারে দুই উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরান সাইফ। তিনি শুরু করেন টেলরকে আউট করে। সাইফের বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে টেলর ক্যাচ তুলে দেন মোসাদ্দেকের হাতে। আরভিনের সঙ্গে ১৭৬ বলে টেলরের ১৫০ রানের জুটিটি ভাঙে টেলর ৮১ রানে আউট হওয়ার পর। পরের ওভারেই ৪ রান করা সিকান্দার রাজার উইকেট পান সাইফ। তবে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ানো আরভিনকে ১০৬ বলে ৯৩ রান করার পর ফিরিয়েছেন শরীফুল ইসলাম।

তা সত্ত্বেও জিম্বাবুয়ে দলকে অলআউট করা যায়নি। শুরুতে দুর্দান্ত বোলিং হলেও মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট ফেলতে না পারাটাই ছিল মূল কারণ। ওয়ানডেতে এই সময়ে উইকেট নেওয়ার সবচেয়ে বড় ‘অস্ত্র’ হিসেবে পরিচিত রিশাদ হোসেনই হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে খরুচে বোলার, যিনি ৯ ওভারে ৬৬ রান দিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের রানের ধারেকাছেও যেতে পারেনি বাংলাদেশ। আগামী ২১ অক্টোবর ত্রিদেশীয় সিরিজের শেষ ম্যাচে আফগানিস্তানের মুখোমুখি হবে তারা। ফাইনালে ওঠার জন্য সেই ম্যাচে জয় তো প্রয়োজনই, পাশাপাশি মেলাতে হবে আরও অনেক সমীকরণ।