সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে দুজন বাংলাদেশির। মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগে তাঁদের এই চরম শাস্তি দেওয়া হয়। তবে ঠিক কী ঘটেছিল, কোন নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য এই দণ্ড দেওয়া হলো কিংবা আদালতের শুনানিতে তাঁরা নিজেদের পক্ষে কী যুক্তি দিয়েছিলেন—সেসবের বিস্তারিত তথ্য এখনো আমাদের কাছে নেই।

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে জানানো হয়েছে যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের দুজন নাগরিকের বিচার চলল, মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো এবং সেই রায় কার্যকর হয়ে গেল; অথচ আমাদের রাষ্ট্র দাবি করছে, তারা আগাম কোনো খবর পায়নি। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, বিদেশে বিপদে পড়া একজন বাংলাদেশির পাশে রাষ্ট্র আসলে কীভাবে দাঁড়ায়?

ওই দুই বাংলাদেশির পেশা বা সৌদি আরবে তাঁদের অবস্থানের ধরন সম্পর্কে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তাই তাঁদের সরাসরি 'অভিবাসী শ্রমিক' বলার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন। তবে এই ঘটনাটি লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করেছে।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই দুজনকে 'তাআজির'-এর আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইসলামি বিচারব্যবস্থায় তাআজির এমন এক ধরনের শাস্তি, যেখানে বিচারকের নিজস্ব বিবেচনার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ, এখানে মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র বাধ্যতামূলক শাস্তি নয়। কিন্তু আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত না হওয়ায় বিকল্প কোনো শাস্তির কথা বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এমন মামলায় মৃত্যুদণ্ড এড়ানোর কোনো সুযোগ ছিল কি না। বাংলাদেশ সরকার যদি আগে জানতে পারত, তবে কি আইনজীবী নিয়োগ, আপিল কিংবা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দণ্ড লঘু করার আবেদন করা যেত না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া এখন জরুরি।

এ ক্ষেত্রে একটি আন্তর্জাতিক আইনের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আমি আইনের ছাত্র নই, তবে সাধারণ নাগরিক হিসেবে যতটুকু বুঝি, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বলছি যে, ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন এই মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁকে কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার সম্পর্কে জানাতে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনুরোধ করলে তাঁর দেশের কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হয়, যাতে কনস্যুলার কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন এবং আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করতে পারেন।

প্রবাসী শ্রমিকেরা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর যন্ত্র নন। তাঁরা মানুষ, বাংলাদেশি। তাঁদের পরিবার আছে, সন্তান আছে, আছে নিজস্ব স্বপ্ন। অনেকেই জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টুকু বিদেশে ব্যয় করেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে। অথচ বিপদে পড়লে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে দুজন বাংলাদেশি দোভাষী হিসেবে সহায়তা করেছেন। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যথাযথ আইনজীবী পেয়েছিলেন কি না, নিজেদের পক্ষে আপিল করার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, কিংবা কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তাঁদের দেওয়া হয়েছিল কি না—তা জানা যায়নি।

এখানেই প্রশ্ন থেকে যায়, বাংলাদেশ মিশন কেন বিচারপ্রক্রিয়ার খবর পায়নি? নাগরিকের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে মিশন বাধ্য। কারণ, এই নাগরিকদের দেওয়া ট্যাক্সের টাকাতেই তাঁদের বেতন হয় এবং বিদেশে নাগরিকদের সহায়তা করা তাঁদের মৌলিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, এই বিষয়ে বাংলাদেশ মিশন থেকে আমরা কেবল একটি দায়সারা ডিপ্লোমেটিক উত্তর পেয়েছি। এই গাফিলতির জন্য কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে কি না, তা আমরা জানি না।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। বিশেষ করে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়ে সংস্থাটি গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বিদেশি নাগরিকদের বিচারিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের উচিত সৌদি সরকারের কাছে এই বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের দাবি জানানো।

এবার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা যাক। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা।

রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়লে সরকার সেই পরিসংখ্যান নিয়ে সাফল্যের কথা প্রচার করে। কিন্তু এই অর্থের পেছনে থাকা মানুষগুলো কী অবস্থায় কাজ করেন, তাঁরা কতটা নিরাপদ থাকেন কিংবা বিপদে পড়লে কত সহজে রাষ্ট্রের সহায়তা পান—তা নিয়ে আমাদের আলোচনা অত্যন্ত সীমিত। বিদেশে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, নিয়োগকর্তার নির্যাতন, বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা অমানবিক কর্মঘণ্টার অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে।

নারী গৃহকর্মীদের অভিজ্ঞতা আরও বেশি উদ্বেগজনক। দ্য ডেইলি স্টার-এ রিজিয়া বেগম নামের এক নারীর অভিজ্ঞতা পড়েছিলাম। ২০১৯ সালে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় তিনি সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে তিনি নিয়োগকর্তার চরম নির্যাতনের শিকার হন। ২০২১ সালের পর পরিবারের সঙ্গে তাঁর সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সন্তানেরা একসময় ধরে নিয়েছিলেন, তাঁদের মা আর বেঁচে নেই। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তিনি নিজের পরিচয়ও ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না। পরবর্তীতে ব্র্যাক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তাঁর পরিচয় শনাক্ত হয় এবং তিনি পরিবারের কাছে ফিরতে পারেন।

ভাবুন, একজন মা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে গেলেন, তারপর বছরের পর বছর তাঁর কোনো খোঁজ নেই। দেশে ফিরে নিজের পরিচয় বলার অবস্থাও নেই। এই মানুষগুলোর জীবনের মূল্য আমরা কীভাবে হিসাব করব?

রিজিয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দ্য ডেইলি স্টারের আরেকটি অনুসন্ধানে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, খাবার না দেওয়া এবং বেতন আটকে রাখার অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, আট বছরে ৭৯৯ জন নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ বাংলাদেশে এসেছে, যার অধিকাংশ মৃত্যু সৌদি আরব থেকে। অনেক মৃত্যুসনদে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকের আত্মহত্যা কি সন্দেহজনক নয়? যেসব পরিবার মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তাঁদের কি স্বাধীন তদন্ত ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার নেই?

আমাদের দূতাবাসগুলোর আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা দরকার। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে আইনি সহায়তা পেয়েছেন ৩৯৫ জন অভিবাসী শ্রমিক, যাঁদের মধ্যে নারী মাত্র ১১ জন।

গত সেপ্টেম্বরে সংসদে জানানো হয়, ১৩টি দেশে ২২টি আইন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইনি সহায়তার চুক্তি হয়েছে। সৌদি আরবে দুটি সেফ হোমও রয়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের তুলনায় এই সহায়তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? একজন শ্রমিক কীভাবে সহায়তা চাইবেন, কত দ্রুত আইনজীবী পাবেন এবং তাঁর অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে?

আমার মনে হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের জন্য একটি কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা। গুরুতর মামলায় দ্রুত আইনজীবী নিয়োগ, বাংলা ভাষায় আইনি সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের মামলায় আগাম কূটনৈতিক উদ্যোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নারী শ্রমিকদের নির্যাতন ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর অভিযোগের তদন্ত নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। দূতাবাসের কার্যকারিতা কেবল কতটি পাসপোর্ট নবায়ন হলো তা দিয়ে বিচার করলে চলবে না; বরং বিপদে কতজন নাগরিক প্রকৃত সহায়তা পেলেন, সেটি জানতে হবে।

প্রবাসী শ্রমিকেরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর যন্ত্র নন। তাঁরা মানুষ, বাংলাদেশি। তাঁদের পরিবার আছে, সন্তান আছে, নিজেদের স্বপ্ন আছে। অনেকেই জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টা বিদেশে কাটিয়ে দেন পরিবারের জন্য। দেশের অর্থনীতির জন্য। অথচ বিপদে পড়লে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?

আমি জানি না, বাংলাদেশ সরকার আগে জানতে পারলে সৌদি আরবে ওই দুজনের মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে পারত কি না। সেই দাবি করার মতো তথ্য আমার হাতে নেই। কিন্তু কেন তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়ার খবর বাংলাদেশ মিশনের কাছে ছিল না, তাঁরা কি আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন এবং তাঁদের পরিবারকে কি জানানো হয়েছিল, তার উত্তর সরকারকে দিতে হবে।

আমরা প্রবাসীদের পাঠানো প্রতিটি ডলারের হিসাব রাখি। অথচ তাঁদের কারও জীবন বিপন্ন হলে রাষ্ট্র কী করেছে, তার হিসাবও তো রাখা দরকার। তা–ই নয় কি?

আসিফ বিন আলী যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরাল ফেলো

মতামত লেখকের নিজস্ব