অবহেলা ও ঔদাসীন্যের কারণে প্রবাস-শ্রমজীবীদের আর একটি প্রাণ যেন হারিয়ে না যায়, সেই দায়ভার গ্রহণ করার এখনই উপযুক্ত সময় রাষ্ট্রের। এই দুটি মৃত্যুদণ্ডকে রাষ্ট্রপক্ষের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কতা-ঘণ্টা হিসেবে গণ্য করতে হবে। লিখেছেন ড. হেলাল মহিউদ্দীন।

দেশজুড়ে মক্কার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের খবর এবার যে পরিমাণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, আগে তেমনটি দেখা যায়নি। এর পেছনে অসংখ্য যৌক্তিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে রাষ্ট্র আদৌ সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা নিয়ে। কারণ, ১৬ অক্টোবর ২০২৬-এর বিভিন্ন পত্রিকা জানায় যে, নজরুল ইসলাম বাসির ও সুইটি (সিতি) আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ঢাকা জানত না। সব সংবাদপত্রের ভাষ্য ছিল এক—সৌদি প্রেস এজেন্সি খবর দেওয়ার পর ১৫ অক্টোবর জেদ্দা কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র দপ্তরকে চিঠি পাঠায়। জেদ্দা কনস্যুলেটের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিচার চলাকালীন বা দণ্ড কার্যকর নিয়ে তাঁরা কোনো নোটিফিকেশন বা কূটনৈতিক পত্র পাননি। সৌদি আরবের বিবৃতিতে শুধু দুটি নাম উল্লেখ ছিল, আকামা বা পাসপোর্টের কোনো তথ্য ছিল না।

তবে ১৯ অক্টোবরের ডেইলি স্টার জানাচ্ছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ সেপ্টেম্বরেই প্রায় ২ হাজার ৫০০ বন্দীর একটি তালিকা দিয়েছিল, যেখানে নজরুল ও সুইটির নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সেই তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা ছিল না। একজনের অপরাধ হিসেবে লেখা ছিল ‘অ্যাডাল্টারি’ বা বিবাহ-বহির্ভূত যৌনক্রিয়া। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, কনস্যুলেট কি অসত্য অজুহাত দেখিয়েছে? সৌদি আরব যেহেতু সেপ্টেম্বরেই বন্দীদের বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল, কনস্যুলেট কেন সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করল না? কেন তথ্যগুলো যথাসময়ে প্রদান করা হলো না কিংবা মামলা অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হলো না? আশঙ্কা আরও বেড়েছে যখন দু-একটি পত্রিকা জানিয়েছে যে, জেদ্দার আদালতে মামলাটি কয়েক মাস ধরে চলেছিল এবং দুজন বাংলাদেশি সেখানে দোভাষীর কাজও করেছেন। মাসের পর মাস বিচার চলল, বাংলাদেশিরাই দোভাষী হিসেবে ছিলেন, অথচ মিশন কিছুই টের পেল না। এই বিষয়টি অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই ১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনস্যুলার সনদে স্বাক্ষরকারী। এই সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে কনস্যুলেটকে দ্রুত জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বন্দীকে অনুরোধ করতে হয়। সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা সম্ভব বাসির এবং সিতির জেনেভা কনভেনশন সম্পর্কে জানার কথা নয়। এমনকি উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও খুব কম মানুষই ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা জানেন। সৌদি পক্ষ না জানালেও, সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৫০০ জনের তালিকায় ‘অ্যাডাল্টারি’ শব্দ দেখেই দূতাবাসের তৎপরতা শুরু করার কথা ছিল। ভয়াবহ বিপদ আসন্ন—এই উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়া কি কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য?

২

বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিদেশের দূতাবাসগুলোর কোনো সাফল্য নেই—এমন ঢালাও অভিযোগ করা অনুচিত। দূতাবাসগুলোর প্রচেষ্টায় ২০১২ থেকে ২০১৬ সালে ২০টি দেশ থেকে ৪৯ হাজার ৫০৩ জন মুক্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১৭ হাজার ৩৩৫ জন এবং আমিরাত থেকে প্রায় ৫ হাজার জন। সৌদি আরবে বাংলাদেশ কনস্যুলেট বিভিন্ন সময়ে গুরুতর অপরাধে বন্দী নন এমন প্রবাসীদের জন্য রাজকীয় ক্ষমার আবেদন নিয়মিত করে আসছেন, তাতে সন্দেহ নেই।

তবে এই বিশাল সংখ্যা দেখে অতি-উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা ১৭ হাজারের বড় একটি অংশই ছিল আকামা বা ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ শ্রমিক। অন্য দেশ থেকে ফেরত আসা ব্যক্তিরাও মূলত অবৈধ অভিবাসী। তাঁদের ‘মুক্তি’ বলতে মূলত বিমানের টিকিট এবং আউট-পাস জোগাড় করে দেওয়ার চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। নিঃসন্দেহে এই কাজটি জরুরি ও মানবিক, তবে এটি রুটিন প্রশাসনিক কাজের অংশ। পৃথিবীর ছোট-বড় সব দেশের দূতাবাসগুলোই এই কাজটি সফলভাবে করে থাকে।

প্রতিবছর রমজান, দুই ঈদ এবং মহানবী (সা.)-এর ওফাত দিবসে সাধারণ ক্ষমায় মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ থেকে বন্দী ও লঘু অপরাধীদের স্বদেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়। ২০১২ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ সাধারণ ক্ষমা এবং রক্তপণ প্রদানের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বন্দীকে মুক্ত করেছিলেন। সেই সময়ে বড় সংখ্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের ফেরার পেছনে এই সাধারণ ক্ষমা একটি বড় কারণ ছিল। বাদশাহর ক্ষমার সুবিধা সব দেশের লঘু অপরাধীরাই পেয়েছিলেন। তবে ২০২১ সালে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের গভর্নর একজন বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ধারণা করা যায়, এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় এবং তৎকালীন সৌদি দূতাবাস সক্রিয় ছিল, যার জন্য তাঁরা সাধুবাদ পেতে পারেন।

৭ অক্টোবর ২০১১ ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি কালো দিন। এক মিসরীয় প্রহরীকে হত্যার দায়ে আট বাংলাদেশি শ্রমিকের শিরশ্ছেদ হয় সেদিন। বাংলাদেশ বারবার ক্ষমা-আবেদনের চেষ্টা করেছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য রক্তপণ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিল। উল্লেখ্য, রক্তপণ হলো শেষ উপায়। যদি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ক্ষতিপূরণের অর্থ গ্রহণ করে এবং অপরাধীদের ক্ষমা করতে রাজি হয়, তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশ সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টার পরও মিসরীয় প্রহরীটির পরিবার রক্তপণ গ্রহণে রাজি হয়নি, ফলে আটজনের শিরশ্ছেদ ঠেকানো যায়নি।

এগুলো ছিল ‘কিসাস’ মামলা। এ ধরনের মামলায় ক্ষমার চাবি থাকে কেবল নিহত ব্যক্তির পরিবারের হাতে; শরিয়া কোর্ট এই বিষয়ে ক্ষমতাহীন। আটজনের মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে রাষ্ট্রপক্ষের আন্তরিক চেষ্টা আশাবাদী করলেও একই বছরে আরেকটি বিষয় চরম হতাশ করেছে। ২০১১ সালের অক্টোবরেই দাম্মাম কারাগারে আটক প্রায় ৫০০ বাংলাদেশিকে ফেরাতে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চায় দাম্মামের হাইকোর্ট। অর্থাৎ সৌদি সরকার সাধারণ ক্ষমায় লঘু অপরাধীদের ফেরত পাঠাতে রাজি ছিল, কিন্তু দূতাবাসের ঔদাসীন্যে টিকিট ও আউট-পাস প্রস্তুত হয়নি। প্রশাসনিক দলিলে প্রচুর ভুলভ্রান্তি ও তথ্যের অসংগতি ছিল, যা স্পষ্ট ঔদাসীন্যের প্রমাণ।

চেষ্টা করলে সাফল্য কি আসলেই অধরা থাকে? উত্তর হলো না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমিরাতে হাসিনাবিরোধী বিক্ষোভের দায়ে দ্রুত বিচারে ৫৭ জন দণ্ড পান। ৩ জন যাবজ্জীবন এবং ৫৩ জন ১০ বছর কারাবাসের সাজা পান। হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়া ড. ইউনূসের সঙ্গে ফোনালাপের এক সপ্তাহের মধ্যেই আমিরাতের প্রেসিডেন্ট তাঁদের ক্ষমা করেন।

৩

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশ দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী হস্তান্তর চুক্তি করেছে কেবল ভারত ও আমিরাতের সঙ্গে (যথাক্রমে ২০১০ এবং ২০১৪ সালে)। ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির বিডি প্রতিদিন পত্রিকার ইংরেজি সংখ্যায় লুৎফুল হকের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল-দুহাইলান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, সৌদি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্দী প্রত্যাবাসন চুক্তিতে আগ্রহী। বাংলাদেশের এতে আপত্তি নেই, প্রস্তাব পেলে সরকার বিবেচনা করবে।

অর্থাৎ, সৌদি আরবই আগে আগ্রহ দেখিয়েছিল। উদ্যোগটি এসেছিল রিয়াদ থেকে, ঢাকা থেকে নয়। কিন্তু বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন ভাব দেখালেন যেন তিনি আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট। প্রস্তাব পেলে বিবেচনা করবেন—এমন প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে মনে করা হলো যেন সৌদি আরবই সংকটে পড়েছে এবং বাংলাদেশের খুব একটা তাড়াহুড়ো নেই। অথচ ভারত ২০১০ সালেই সৌদি আরবের সঙ্গে এই চুক্তি করেছে।

৪

অবৈধ অভিবাসীদের জেল থেকে ছাড়ানো এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মামলার পেছনে প্রাণপণ চেষ্টা করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি হিসাবের খাতার কাজ, দ্বিতীয়টি প্রাণ বাঁচানোর লড়াই। এবারের দুজনের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় জনরোষ তাই অনেকাংশেই যৌক্তিক। মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলায় দূতাবাসের অনিবার্য দায়িত্ব হলো গ্রেপ্তারের দিন থেকে প্রতিটি মুহূর্তের খবর রাখা: অভিযোগপত্র কেমন, আইনজীবী আছে কি না, দোভাষী নিরপেক্ষ কি না, আপিল কবে, রায় কী এবং পরিবার তা জানে কি না।

ইন্দোনেশিয়া একজন নাগরিকের প্রাণ বাঁচাতে রক্তপণের টাকা সংগ্রহ করে, আইনজীবী নিয়োগ করে এবং বছরের পর বছর পরিবারের সঙ্গে দর-কষাকষি চালিয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে দেশটির অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। ২০১১ সালে না জানিয়ে রুয়াতি নামের গৃহকর্মীর শিরশ্ছেদের পর জাকার্তা সৌদিতে গৃহকর্মী পাঠানো স্থগিত করে। আবার ২০১৪ সালে সাতিনাহ নামে আরেকজনকে বাঁচাতে সরকার নিজে প্রায় ১৮-১৯ লাখ ডলার রক্তপণ দেয়। জাকার্তার চেষ্টায় সাতিনাহর ফাঁসি পাঁচবার পিছিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়োধোয়োনো নিজে সৌদি কর্তৃপক্ষকে তিনটি চিঠি দিয়েছিলেন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও চারজনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

ফিলিপাইন ২০১১ সালে গৃহকর্মীদের ন্যূনতম মজুরি দাবি করলে সৌদি আরব নিয়োগ বন্ধ করে দেয়। ম্যানিলা পিছু হটেনি এবং শেষ পর্যন্ত রিয়াদ মাসে ৪০০ ডলার মজুরিতে রাজি হয়। ২০১৩ সালের মে মাসে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ১ হাজার ৫০০ রিয়াল ন্যূনতম বেতন, সাপ্তাহিক ছুটি, বেতনসহ ছুটি, পাসপোর্ট আটকে না রাখা, মুক্ত যোগাযোগ এবং ২৪ ঘণ্টার সহায়তা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়।

ফিলিপাইন ২০১৮ সালে কুয়েতে গৃহকর্মী জোয়ানা ডেমাফেলিসের লাশ ফ্রিজারে পাওয়ার পর শ্রমশক্তি পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ১১ মে ২০১৮-এর চুক্তিতে তাঁরা শ্রমিকের নিজস্ব ফোন রাখা, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন এবং উদ্ধারকাজে দূতাবাসের জন্য বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সহায়তা পাওয়ার অধিকার আদায় করে নেয়।

রবিন রদ্রিগেজের বই ‘মাইগ্র্যান্টস ফর এক্সপোর্ট’-এ ফিলিপাইনকে ‘শ্রম দালাল রাষ্ট্র’ বলে সমালোচনা করা হলেও এটি স্বীকার করতে হয় যে, রাষ্ট্র চাইলে শ্রমিক রপ্তানিকে কল্যাণ দপ্তর, শ্রম অ্যাটাশে এবং আইনি সহায়তা কাঠামোর মাধ্যমে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলে বাঁধতে পারে।

শ্রম রপ্তানির আগে শ্রম কল্যাণে ভারতও পিছিয়ে ছিল না। ২ জানুয়ারি ২০১৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে গৃহকর্মী নিয়োগ চুক্তিতে নিয়োগ খরচ বেতন থেকে কাটা নিষিদ্ধ করা হয়। শ্রমিকের নামে ব্যাংক হিসাব, ২৪ ঘণ্টার সহায়তা এবং জরুরি অবস্থায় এক্সিট ভিসার ব্যবস্থা রাখা হয়। একই মাসে শ্রীলঙ্কাও প্রায় একই রকম চুক্তি করে।

অথচ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ বাংলাদেশ যে গৃহকর্মী চুক্তি করে, তাতে মজুরি ধরা হয় মাত্র ৮০০ রিয়াল, যা ফিলিপাইনের প্রায় অর্ধেক। আরএমএমআরইউর (রামরু) তাসনিম সিদ্দিকী তখনই বলেছিলেন, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া কর্মী পাঠানো বন্ধ রাখায় বাংলাদেশের দর কষার সুযোগ ছিল। তিনি দূতাবাস থেকে নারী কর্মীদের মাসে অন্তত একটি ফোন করার দাবিও তুলেছিলেন। বায়রা সভাপতি স্বীকার করলেন, তাঁরা বাজার খোলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। যে মুহূর্তে আমাদের হাতে তুরুপের তাস ছিল, আমরা সুরক্ষা ও মর্যাদা না চেয়ে কেবল বাজারের কথা বলেছি।

৫

বাসির-সিতির মৃত্যুদণ্ডের রায়টি একেবারেই অস্বাভাবিক এবং খটকা জাগানোর মতো। এটি যুক্তিবুদ্ধিতে কুলানোর বাইরে। আদালত দণ্ড দিয়েছেন শরিয়াহর ‘তাআজির’ বা বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তির বিধানে। ইসলামি ফৌজদারি আইনে অপরাধের বিচারের ধারা তিনটি: হদ, কিসাস এবং তাজির। জেনা বা ব্যভিচারের শাস্তি হদ-এর আওতাধীন, যা কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত। হদ প্রমাণের শর্ত অত্যন্ত কঠিন; চারজন প্রাপ্তবয়স্ক ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। সাক্ষীদের আমলনামায় কোনো কালি থাকা চলবে না। আগে মিথ্যা বলা বা অন্য কোনো অপরাধে সাজা খেটে থাকলে তারা সাক্ষী হওয়ার অযোগ্য।

প্রমাণে সামান্য সন্দেহ থাকলেও হদ মওকুফ হয়ে যায়। ফকিহদের মতে, ‘সন্দেহ থাকলেই হদ বাতিল’। হদ-এ অভিযুক্তদের অধিকার স্বীকৃত; তাঁরা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিতে পারেন বা আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করতে পারেন। এই পদ্ধতির দর্শন আধুনিক বিচারব্যবস্থার মতোই, যাতে মানসিক অস্থিরতার কারণে ভুল স্বীকারোক্তি না দেওয়া হয়।

তাজির এর বিপরীত। সাধারণত ছোট অপরাধ যেমন প্রতারণা, অশ্লীল গালাগালি বা মারামারির বিচার তাজির-এ হয়। অধিকাংশ মাজহাবের ধর্মবেত্তাদের মতে, তাজির কখনোই এমন মাত্রাছাড়া হবে না যা হদ-এর কাছাকাছি শাস্তি মনে হয়। অনেক আলেম তাজির-এ দশ বেত্রাঘাতের বেশি শাস্তির বিধান দেননি। তবে এটি সত্য যে, সৌদি আরব মাদক মামলাতেও আগে দু-একজনকে তাজিরে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছে।

বাসির-সিতির অপরাধটি ‘অনৈতিক সম্পর্ক’, যা ‘জেনা’র পর্যায়ে পড়তে পারে। তাহলে হদ না হয়ে তাজির কেন? চার সাক্ষী কোথায়? অকাট্য প্রমাণ কোথায়? দুজন বাংলাদেশি দোভাষী নাকি ছিল—তাঁরা কারা, তাঁদের পরিচয় কী? এটি কি আসলে বিচারিক হত্যাকাণ্ড নয়?

রুডলফ পিটার্স তাঁর ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট ইন ইসলামিক ল’ বইতে হদ, কিসাস এবং তাজিরের পার্থক্য ও প্রয়োগবিধি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, তাজিরের অধীনে কঠোর শাস্তির পেছনে মূল অপরাধের বাইরে অন্য কোনো গূঢ় কারণ থাকে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর কি সেই কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করবে? বিষয়টি সংবেদনশীল হলে জনসমক্ষে প্রচার না করে ‘ক্লাসিফায়েড’ রেখেও নিজেদের ভবিতব্য নির্ধারণের পাঠ হিসেবে কারণ অনুসন্ধান করা দরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্তত চারটি বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দিতে পারে: এক, প্রতিটি মিশনে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলার তালিকা ও নজরদারি সেল তৈরি করা, যেখানে প্রতি মাসে কারাগার ও আদালতের হালনাগাদ তথ্য থাকবে। দুই, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল থেকে আইনজীবী, স্বাধীন দোভাষী এবং প্রয়োজনে রক্তপণের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা, যেমনটি ইন্দোনেশিয়া করেছে। তিন, সৌদি আরব যে বন্দী হস্তান্তর চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করে দ্রুত চুক্তিতে পরিণত করা। চার, পরবর্তী প্রতিটি শ্রম চুক্তিতে কনস্যুলার নোটিফিকেশন ও আইনি সহায়তার ধারা আলাদা করে লেখা।

বাসির-সিতিকে আর ফেরানো যাবে না। কিন্তু অবহেলা-ঔদাসীন্যে প্রবাস শ্রমজীবীদের আর একটি প্রাণ যেন ক্ষয় না হয়, সেই দায় ও দায়িত্ব নেওয়ার এখনই সময় রাষ্ট্রের। এই দুটি মৃত্যুদণ্ডকে গণ্য করতে হবে রাষ্ট্রপক্ষের জন্য চূড়ান্ত সতর্কতা-ঘণ্টা হিসেবে।

ড. হেলাল মহিউদ্দীন
শিক্ষক, লিবারেল আর্টস, ম্যেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডেকোটা, যুক্তরাষ্ট্র
(মতামত লেখকের নিজস্ব)