সৌদি আরবে ‘অনৈতিক কাজ’-এর দায়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশের পর জেদ্দার কনস্যুলেট বিষয়টি জানতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস ধরে আদালতে বিচারকাজ চলেছে, রায় প্রদান করা হয়েছে এবং উচ্চতর কর্তৃপক্ষ সেই রায় বহাল রেখেছে। এরপর রাজকীয় আদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল। এই পরিস্থিতি রীতিমতো বিস্ময়কর এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করলে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক।

এটি অনস্বীকার্য যে, বিদেশে অবস্থানকারী প্রত্যেক নাগরিককে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে চলতে হয়। তবে বিদেশে কোনো নাগরিক অভিযুক্ত হলে দুই দেশের ওপরই কিছু বিধিবদ্ধ দায়িত্ব বর্তায়। অভিযুক্ত নাগরিকের সঙ্গে কনস্যুলার যোগাযোগ রক্ষা করা, দক্ষ আইনজীবী ও দোভাষীর ব্যবস্থা করা এবং বিচারপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে চলছে কি না তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা মিশনের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে এই অধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে এবং বাংলাদেশ ও সৌদি আরব—উভয় দেশই এই সনদের পক্ষভুক্ত। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কনস্যুলেটকে জানাতে চেয়েছিলেন কি না, তা আমাদের জানা নেই; তবে আমরা মনে করি, মিশন যদি সক্রিয় ভূমিকা পালন করত, তবে এমন একটি মামলার খবর তাদের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। উল্লেখ্য, সুদৃঢ় কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে একাধিক দেশ সৌদি আরবে তাদের নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড এড়াতে সক্ষম হয়েছে, যার প্রমাণ বিদ্যমান।

এই ব্যর্থতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। নিয়মিতভাবে নারী গৃহকর্মীদের মরদেহ দেশে ফিরছে। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র; দেখা গেছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীর ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় যে ধরনের অগ্রণী পদক্ষেপ নিয়েছে, বাংলাদেশ তার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে (মুক্তকণ্ঠ, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

সাম্প্রতিক এই মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাটি মূলত সৌদিসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের ধারাবাহিক ব্যর্থতারই এক বহিঃপ্রকাশ।

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের মন্তব্য অত্যন্ত হতাশাজনক। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আইনি সহায়তার প্রাপ্তি কিংবা রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে নাগরিকদের জন্য কেবল ‘শিক্ষা’র পরামর্শ দেওয়া অনভিপ্রেত। এর পাশাপাশি ‘পাপের লাশ’ দেশে না আনা-সংক্রান্ত এক সরকারদলীয় আইনপ্রণেতার বক্তব্য অমানবিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। জেদ্দার কনস্যুলেটের ব্যর্থতা এবং সৌদি আরবের একপেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের বাস্তবতায় এ ধরনের মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনাটি প্রকাশের প্রায় পাঁচ দিন পর বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতের কাছে দুই বাংলাদেশির বিষয়ে জানতে চেয়েছে ঢাকা। এই উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও আমাদের প্রশ্ন রয়েই যায়—এই পদক্ষেপ কেন আরও আগে নেওয়া হলো না? আমরা মনে করি, প্রথমত, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য আদায়ের জন্য সরকারের কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। গ্রেপ্তারের তারিখ, নির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ, আইনি প্রতিনিধিত্ব এবং কনস্যুলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা বিস্তারিত জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে বিষয়টি জানানো, মরদেহ ফেরত বা দাফনের তথ্য প্রদান এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মিশন কেন আগে বিষয়টি জানতে পারেনি, তার একটি স্বচ্ছ তদন্ত করে দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত, বিদেশে আটক বা বিচারাধীন বাংলাদেশিদের জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দ্রুত আইনজীবী নিয়োগ, বাংলা ভাষায় সহায়তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মামলার ক্ষেত্রে আগাম কূটনৈতিক উদ্যোগের সংস্থান থাকবে।