মক্কায় বাংলাদেশের দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনায় জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কোনো দুর্বলতা বা গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এই প্রক্রিয়ায় যদি কোনো ধরনের অবহেলা প্রমাণিত হয়, তবে সে বিষয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা বিস্তারিতভাবে কমিটিকে জানাতে বলা হয়েছে।
আজ রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ১৪ দিন আগেই সৌদি আরব প্রায় আড়াই হাজার বন্দীর একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। সেই তালিকায় ওই দুই বাংলাদেশি নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল; তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বিষয়টি যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য ও সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি নারী কর্মীদের মধ্যে প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ নির্যাতনের শিকার হন। এই সংখ্যাটিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কমিটির সদস্যরা উল্লেখ করেন, শতাংশের হিসেবে এই সংখ্যাটি কম মনে হলেও প্রকৃত সংখ্যার হিসেবে নারী নির্যাতনের ঘটনা অনেক বেশি এবং উদ্বেগজনক।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তাঁরা জানতে চেয়েছেন কনস্যুলার আগে কেন জানতে পারেনি, এখানে কোনো দুর্বলতা বা অবহেলা ছিল কি না, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক তাহলে তারা কেন আগে এটা জানাল না।” তিনি আরও বলেন, এই পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপটে বোঝা যাচ্ছে যে সবকিছু মিলিয়ে এখানে একটি দুর্বলতা বিদ্যমান ছিল।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ১৪ দিন আগে তথ্য বিনিময়ের কথা উল্লেখ করে জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, “ওনারা এটা স্বীকার করেছেন যে ওই রিপোর্টটা আসলে ওইভাবে কেউ আইডেন্টিফাই করেনি।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, ওই তালিকায় বন্দীদের যে ক্যাটাগরি বা শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল, তা দেখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল যে তাদের ৬ মাস থেকে ১৫ বছরের জেল হতে পারে। তারা বুঝতে পারেননি যে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে। এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের জবাব চেয়েছে। সেই জবাব পাওয়া গেলে তা সংসদীয় কমিটিকেও জানাতে বলা হয়েছে। এছাড়া কনসুলেটের কোনো অবহেলা ছিল কি না, থাকলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—সে বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছে সংসদীয় কমিটি।
নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জহরত আদিব চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সৌদি আরবে নারী শ্রমিক ‘অ্যাবিউজের’ দুঃখজনক অনেক ঘটনা ঘটে। মন্ত্রণালয় একটি তথ্য তুলে ধরেছে। এখন সেখানে ১ লাখ ৬৯ হাজারের মতো নারী শ্রমিক আছেন। পাসপোর্ট নিতে এলে তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে জরিপ করা হয়। ১ হাজার ৩৬৪ জন নারী গৃহকর্মীকে উদ্ধার এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসন করা হয়েছে। সৌদি আরবে ১–২ শতাংশ নারী শ্রমিক ‘অ্যাবিউজের শিকার’ হন বলে মন্ত্রণালয় একটি তথ্য তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, ১–২ শতাংশ শুনলে ছোট সংখ্যা বলা হয়; কিন্তু ১ হাজার ৩৬৪, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কমিটি মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে।
জহরত আদিব চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে কমিটির সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন, এস কে আজিজুল বারী, সাঈদ আল নোমান, হুমাম কাদের চৌধুরী এবং সানজিদা ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কমিটির বিশেষ আমন্ত্রণে বৈঠকে অংশ নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।