সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহত পুরুষটির বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় এবং নারীর নাম সুইটি আক্তার, যার বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায়। তবে সৌদি আরব কিংবা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

সুইটি আক্তারের মৃত্যুর খবর শুনে তার বাবা-মা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছেন না। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সুইটির মায়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, “মেয়ের স্বামী আরেকটি বিয়ে করায় আমরা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসি। পরে মেয়ে আর সংসারে থাকতে চায়নি। সে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়।”

তিনি আরও বলেন, “প্রথম দিকে সুইটির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। হঠাৎ তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে মেয়ের এক বান্ধবী ফোন করে আমাদের জানায়, সুইটি সৌদি আরবের জেলে রয়েছে। এখন জানতে পারলাম, আমার মেয়েকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। মেয়ের এমন পরিণতিতে আমরা দিশেহারা। এ ব্যাপারে সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন জানাই।”

এই মর্মান্তিক ঘটনায় স্থানীয় চেয়ারম্যান বিবাস সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের খবরটি জানার পর আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও স্পর্শকাতর। সুইটির পরিবার যেন সঠিক তথ্য পায় এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১১ আগস্ট জন্ম নেওয়া সুইটি আক্তার ২০২৩ সালে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সরকারি নথি অনুযায়ী, ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বহির্গমন ছাড়পত্র পান। ‘এস রানা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ নামক একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তিনি সৌদি আরবে যান এবং সেখানে তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ‘আল মাজাল আল আরাবি গ্রুপ কোম্পানি’।

গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলের একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওই নারীর নাম সুইটি আক্তার এবং পুরুষের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বশির হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তদন্ত শেষে দুজনকে আদালতে হাজির করা হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। রাজকীয় আদেশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর ১৪ অক্টোবর মক্কায় তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য এই সাজা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।

জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের বিষয়টি জানায়নি। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি গত ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তারা বিষয়টি জানতে পারেন এবং পরবর্তীতে বিচারপ্রক্রিয়া ও আদালতের রায় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, সৌদি আরবের পাঠানো বন্দিতালিকায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম থাকলেও তাদের সাজা সম্পর্কে কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না। এই বিষয়ে বাংলাদেশ পুনরায় কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে মামলার বিস্তারিত বিবরণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার তথ্য চেয়েছে।

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ফরিদ বিন সাদ আল সেহেরির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেন বিষয়টি উত্থাপন করেন। বৈঠকে তিনি প্রশ্ন করেন, নিয়মিত পাঠানো বন্দিতালিকায় দুই বাংলাদেশির নাম ও অপরাধের উল্লেখ থাকলেও তাদের মৃত্যুদণ্ডের তথ্য কেন জানানো হয়নি? তিনি উল্লেখ করেন, তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য থাকলে জেদ্দা মিশন তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেত। তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি কূটনীতিক এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।