সৌদি আরবে বন্দী প্রবাসী শ্রমিক ছেলেকে নিয়ে প্রবল উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার বলরামপুর গ্রামের বাসিন্দা কোহিনূর বিবি। সম্প্রতি পবিত্র মক্কা নগরের একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব সরকার। এই ঘটনার পর থেকে সাহাবুদ্দিনের পরিবারের উদ্বেগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ভারতের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
অভিযোগ করা হয়েছে যে, ওই ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কোহিনুর বিবির ছেলে এবং মসজিদের পরিচ্ছন্নতাকর্মী শেখ সাহাবুদ্দিন। বাংলাদেশি যুগলের প্রাণদণ্ডের পর ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা দিন দিন বাড়ছে কোহিনূর বিবিসহ মুর্শিদাবাদের বলরামপুর গ্রামের বাসিন্দাদের মনে। বর্তমানে সাহাবুদ্দিন নিজেও বন্দী অবস্থায় সৌদি আরবের কারাগারে চিকিৎসাধীন বা আটক রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালে, যখন সৌদি আরবের মক্কা নগরের একটি মসজিদে অবমাননাকর আচরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিক শেখ সাহাবুদ্দিন। তিনি ওই মসজিদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সাহাবুদ্দিনের উপস্থিতিতে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আব্দুল বসির এবং সুইটি আক্তার মসজিদের অভ্যন্তরে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হন। সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত অন্য এক তরুণ সাহাবুদ্দিনের মুঠোফোন ব্যবহার করে ওই দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।
পরবর্তীতে সাহাবুদ্দিন সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে সাহাবুদ্দিনের পরিবারের দাবি, তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাঁদের মতে, নেহাতই খেয়ালের বশে এবং বিষয়টির ভয়াবহতা বুঝতে না পেরে তিনি ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে এটি পবিত্র স্থানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার মতো এক গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ফলে ভিডিওটি পোস্ট করার অপরাধে সাহাবুদ্দিনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয় এবং সে দেশের আদালত তাঁকে কারাদণ্ড প্রদান করেন।
ঘটনার তিন বছর পর, চলতি অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই দুই বাংলাদেশি নাগরিককে ‘তাজির’ আইনের অধীনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দেয়। এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর থেকেই মুর্শিদাবাদে সাহাবুদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যের ক্ষেত্রেও চরম শাস্তি হতে পারে—এই ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধা মা কোহিনূর বিবি ও তাঁর স্বজনরা।
কোহিনূর বিবি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেছেন, তাঁর সন্তান কোনো বড় অপরাধ করেননি। তাঁর একমাত্র দোষ ছিল ভুলবশত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই বাংলাদেশি যুগলের ভিডিও শেয়ার করা।
এই পরিস্থিতি নিয়ে বলরামপুর গ্রামের মানুষের মধ্যেও নানা আলোচনা চলছে। স্থানীয় প্রবীণ আবু তালেব বলেন, ‘সাহাবুদ্দিন ছোট থেকেই খুব শান্ত ধীরস্থির ছেলে। কোনো দিন কোনো ঝামেলায় জড়াননি। প্রতিদিন নিষ্ঠার সঙ্গে নামাজ আদায় করেছেন। পেটের টানে বিদেশে গিয়ে বিনা দোষে বিপদে পড়েছেন। তাঁর রোজগারের ওপরেই নির্ভর করে পুরো পরিবার। কিন্তু তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সবাই খুব চিন্তিত।’
সাহাবুদ্দিনকে মুক্ত করে ভারতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রবাসী ভারতীয় শ্রমিকদের সহায়তায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংগঠন ও সমাজকর্মীরা ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এখন এই মামলার তদন্ত এবং কূটনৈতিক পর্যালোচনার দিকে তাকিয়ে আছে অসহায় পরিবারটি। একদিকে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মর্মান্তিক পরিণতি এবং অন্যদিকে কোনো স্পষ্ট আইনি সুরাহা না থাকায় গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে সাহাবুদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা।