ব্যাট হাতে ট্রাভিস হেড কী করতে পারেন, তা ক্রিকেট বিশ্বের সবারই জানা। তবে এই বাক্যটিতে সামান্য পরিমার্জন perhaps প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে হেড কী করতে পারেন, তা সবাই প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে যখন তিনি দেশের বাইরে খেলেন, তখন যেন তাঁর ব্যাট কথা বলে ওঠে না; দর্শক তখন আর কী দেখবেন!

দুই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে হেডের পারফরম্যান্সের পার্থক্য কতটা প্রকট? পরিসংখ্যান বলছে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে হেডের ব্যাটিং গড় ৫১.৮৬, যা বিদেশের মাটিতে নেমে দাঁড়ায় ৩১.৬২-এ। সর্বশেষ ডারবান টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ২০ রান করে আউট হওয়ার পর সেই পুরোনো প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে—বিদেশের মাটিতে হেডের আসলে কী হয়?

ঘরে সিংহ, বিদেশে কেন ম্লান

আগ্রাসী ব্যাটিং শৈলী, দ্রুত রান তোলার অসাধারণ ক্ষমতা এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য—এই সব মিলিয়ে ট্রাভিস হেড বর্তমান অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ক্রিকেটার। তবে বিদেশের মাটিতে তাঁর পারফরম্যান্স এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে। তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের মোট ১২টি সেঞ্চুরির মধ্যে ১১টিই এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে।

অবশ্য ঘরের মাঠে ভালো খেলা কোনো ব্যাটসম্যানের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। মাইকেল হাসির ক্যারিয়ারেও ঘরের মাঠ ও বিদেশের পারফরম্যান্সের মধ্যে এমন বড় ব্যবধান ছিল। এমনকি মাইকেল ক্লার্ক ও ডেভিড ওয়ার্নারের ক্ষেত্রেও বিদেশের মাটিতে ব্যাটিং গড় কিছুটা কমেছে। তাই কেবল হেডের পরিসংখ্যানকে আলাদা করে বিচার করা সঠিক হবে না। তবে তাঁর মতো একজন প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে এই ব্যবধানটি যে আলোচনার দাবি রাখে, তা অনস্বীকার্য।

ডারবানে হেডের ব্যর্থতা

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসে তাঁর সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ৯ ও ১১ রান। প্রথম ইনিংসে লেগ সাইডে বল খেলার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন। দ্বিতীয় ইনিংসে মিড-অনের দিকে লিডিং এজ তুলে দিয়ে আউট হন তিনি।

ডারবানে অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডারের মধ্যে সবচেয়ে কম রান এসেছে হেডের ব্যাট থেকেই। এই ধরনের পারফরম্যান্স তাঁর প্রকৃত সামর্থ্যের সাথে মোটেও মেলে না। বিশেষ করে, বিদেশের মাটিতে তাঁর রেকর্ড যখন আগে থেকেই বিতর্কিত, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এই ব্যর্থতা আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

তবে মাত্র দুই ইনিংসের ব্যর্থতা দিয়ে কোনো ব্যাটসম্যানের পুরো সিরিজকে বিচার করা যায় না। সামনে আরও দুটি টেস্ট ম্যাচ রয়েছে, সেখানে একাদশে থাকলে হেডের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকবে। তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের একটি মাত্র ভালো ইনিংসই পুরো আলোচনার সুর বদলে দিতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই কাঙ্ক্ষিত ইনিংসটি কি বিদেশের মাটিতেও আসবে?

ওপেনিংয়ে সাফল্য ও ছন্দপতন

হেডের সাম্প্রতিক ক্যারিয়ারে ব্যাটিং পজিশনে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন পাঁচ নম্বরে ব্যাটিং করা এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান এখন টেস্টে ওপেনার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। যদিও এই পরিবর্তনের শুরুটা ছিল মূলত প্রয়োজনের তাগিদে।

২০২৩ সালে দিল্লি টেস্টে কনকাশনের কারণে মাঠ ছাড়েন ডেভিড ওয়ার্নার। তাঁর বদলি হিসেবে ওপেনিংয়ে নামেন হেড। পরবর্তীতে সিরিজের বাকি অংশেও তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর অ্যাশেজ সিরিজে পার্থ টেস্টে রান তাড়ার সময় ওপেনিংয়ে ফেরেন এবং সেখানেই এখন স্থায়ী হয়েছেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওপেনার হিসেবে তিনটি সেঞ্চুরি করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে এই পজিশনে তিনি কতটা ভয়ংকর হতে পারেন। বিশেষ করে অ্যাশেজে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত নজরকাড়া। কিন্তু সেই সাফল্যের পর থেকেই শুরু হয়েছে কঠিন সময়। গত আগস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে তিনবার বোল্ড হওয়ার পর ডারবানে দুই ইনিংসেই কম রানে আউট হয়েছেন হেড।

পরিসংখ্যানের লড়াই: ওপেনিং নাকি পাঁচ নম্বর?

হেডের ব্যাটিং পজিশন নিয়ে আলোচনায় তাঁর ইনিংসভিত্তিক পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওপেনার হিসেবে টেস্টের প্রথম ইনিংসে তাঁর গড় মাত্র ২৩.৬৬। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে সেই গড় বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯.৬০। তৃতীয় ইনিংসে তা ৬২.৮৩ এবং চতুর্থ ইনিংসে ৬০.৭৫।

এর অর্থ হলো, ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের চ্যালেঞ্জ সামলাতে তিনি তুলনামূলক বেশি সমস্যায় পড়ছেন। অথচ ম্যাচ যত এগিয়েছে, হেডের গড় তত বেড়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংস একসঙ্গে বিবেচনা করলে ওপেনার হিসেবে তাঁর গড় যথাক্রমে ৩৫.৪৫ ও ৬২।

এর পেছনে কন্ডিশনের প্রভাব থাকতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের মতো জায়গায় নতুন বলের চ্যালেঞ্জ, পিচের আচরণ এবং প্রথম দিনের পরিবেশ ব্যাটসম্যানদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে থাকে। হেডের ছয়টি প্রথম ইনিংসের মধ্যে চারটিই এসেছে এমন কন্ডিশনে খেলা ম্যাচে।

অন্যদিকে, পাঁচ নম্বরে তাঁর পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে। এই পজিশনে প্রথম ইনিংসে হেডের গড় ৫৪.৬৯, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬.০৪, তৃতীয় ইনিংসে ২৭.৪৩ এবং চতুর্থ ইনিংসে ৪০.৫০। প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংসের গড় যথাক্রমে ৪৬.৩৬ ও ৩১।

অর্থাৎ, ওপেনার হিসেবে ম্যাচের পরের ইনিংসগুলোতে হেডের গড় ভালো হলেও পাঁচ নম্বরে প্রথম ইনিংসে তাঁর রেকর্ড বেশ শক্তিশালী। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, দুই পজিশনে খেলা ম্যাচের সংখ্যা ও পরিস্থিতি এক নয়।

হেডের বক্তব্য

সিরিজ শুরুর আগে ক্রিকইনফোকে হেড বলেছিলেন, “আমি সব সময় ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। ওপেনিংয়ে অল্প সময়ের অভিজ্ঞতাতেও মনে হয়েছে, প্রতিটি ইনিংসে নিজেকে সুযোগ দিতে পারি। সেটা বল মোকাবিলা করা হোক কিংবা বোলারদের কঠিন স্পেল পার করা—পাঁচ নম্বরেও বিষয়টা একই।”

একই সাক্ষাৎকারে হেড আরও বলেন, “কখনো ১০ বল, কখনো ২০ বল—নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সময় নিতে হয়। প্রক্রিয়াটা ঠিক থাকলে একসময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়। কখনো একটু বেশি সময় লাগে, কখনো কম। আমি তাই নিজের প্রক্রিয়াতেই মনোযোগ রাখি।”