অস্ট্রেলিয়া ৬ উইকেটে ৩১৪ রানে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণার পর দক্ষিণ আফ্রিকার ফিল্ডারদের মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটা ছিল একটু অন্যরকম।
ইতিহাস বলছে, ততক্ষণে ডারবান টেস্ট থেকে প্রায় ছিটকে গেছে প্রোটিয়ারা। ৪২১ রানের লক্ষ্য সামনে, এত রান তাড়া করে তারা জিতে গেলে সেটি হয়ে যাবে বিশ্ব রেকর্ডই। চতুর্থ ইনিংসে তাই ব্যাটিংয়ে নামার চাপে কোথায় প্রোটিয়াদের কাঁধ ঝুলে যাবে, তা না, অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা কি না পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিলেন সতীর্থদের! হয়তো অসম্ভবের লক্ষ্যের দিকে ছোটার আগে সতীর্থদের একটু হালকা রাখতে চেয়েছেন বাভুমা।
তাতে কতটা লাভ হয়েছে তা একটা প্রশ্ন বটে। চতুর্থ দিনের খেলা শেষে এখনই বলে দেওয়া যায় ডারবানে হারের দিকে এগোচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ৪ উইকেটে ১০২ রানে চতুর্থ দিনের খেলা শেষ করেছে তারা। অস্ট্রেলিয়ার ছুঁড়ে দেওয়া লক্ষ্য থেকে এখনো ৩১৯ রানে পিছিয়ে বাভুমার দল। ক্রিজে আছেন এইডেন মার্করাম (৪৫*) ও উইয়ান মুল্ডার (৫*)।
এখান থেকে জয় দূরের কথা, আগামীকাল তিন সেশন ব্যাট করে ড্র করাটাই প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। টেস্ট ক্রিকেটে ১৪৯ বছরের ইতিহাসে এত রান তাড়া কেউ জিততে পারেনি। সর্বোচ্চ ৪১৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটিও ২৩ বছর আগে— অ্যান্টিগায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছিল তা।
প্রোটিয়াদের বাকি ব্যাটসম্যানদের কাছে তাই ক্রিজে কচ্ছপ–কামড় দিয়ে পড়ে থেকে ম্যাচটা ড্রয়ের পথ বের করা ছাড়া আর কোনো পথ আছে বলে মনে হচ্ছে না। আজ এক সেশনের একটু বেশি সময় ব্যাট করেছে প্রোটিয়ারা। সেখানে ৪ উইকেটে ১০২ রান উঠেছে। এর মানে জিততে হলে আগামীকাল পঞ্চম দিনের ভঙ্গুর উইকেটে তিন সেশনে গড়ে ১০০ এর বেশি করে রান তুলতে হবে বাভুমার দলকে। হাতে আছে কেবল ৬ উইকেট। মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নদের বিপক্ষে কি সেটা সম্ভব? মস্তিস্ক বলছে, না। তিন সেশন টিকে থাকাই তো প্রায় অসম্ভব!
বিনা উইকেটে ৩৩ রানে তৃতীয় দিনের খেলা শেষ করা অস্ট্রেলিয়া আজ যখন ব্যাটিংয়ে নামে, তখন তাদের ছিল ১০৬ রানের লিড। দ্বিতীয় সেশনের বেশির ভাগ সময় ব্যাট করে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে। তাতে একটু আগেভাগেই চা বিরতি নেওয়া হয়। ৫০ ওভারেও অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ছিল ৫ উইকেটে ২২০। ইনিংস ঘোষণার আগে সেখান থেকে পরের ৮ ওভারে অস্ট্রেলিয়া তুলেছে ৯৪!
পঞ্চম উইকেটে অ্যালেক্স ক্যারির সঙ্গে ম্যাট রেনশর ৪৮ রানের জুটি ভাঙার পর রানের গতি বাড়ায় অস্ট্রেলিয়া। ষষ্ঠ উইকেটে বো ওয়েবস্টার ও রেনশর জুটিতে উঠেছে ৭১ বলে ৬৫। সপ্তম উইকেটে ওয়েবস্টার–কামিন্স জুটিতে ১৯ বলে অবিচ্ছিন্ন ৪৪। এর মধ্যে প্রোটিয়া অফস্পিনার সাইমন হারমারের করা ৫৮তম ওভারেই এসেছে ২৩ রান!
আগের ইনিংসে ১০ রানের জন্য ডাবল সেঞ্চুরি মিস করা রেনশ এই ইনিংসে করেছেন ৮২ রান। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক কামিন্সও পরিস্থিতি বুঝে এই ইনিংসে হাত খুলেছেন। ১২ বলে অপরাজিত ছিলেন ৩২ রানে। ৪৩ বলে ৩৯ এসেছে ওয়েবস্টারের ব্যাট থেকে। সকালের সেশনে ৩৮ বলে ৪৮ রানে আউট হন ১০ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হওয়া নিক ম্যাডিনসন। ২৭ রান আসে স্টিভেন স্মিথের ব্যাট থেকে। অস্ট্রেলিয়া আজ ফিল্ডিংয়ে নামার সময় স্মিথকে দেখা যায়নি।
দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ব্যাটিংয়ের সময় প্রোটিয়া পেসার আনরিখ নর্কিয়ার বলে হেলমেটে আঘাত পান স্মিথ। তখন ব্যাটিং চালিয়ে গেলেও পরে ‘কনকাশন’ সতকর্তা হিসেবে তাঁকে ফিল্ডিংয়ে নামানো হয়নি। স্মিথের জায়গায় ফিল্ডিংয়ে নামেন মাইকেল নেসার।
প্রোটিয়াদের দ্বিতীয় ইনিংসে আজ প্রথম দুটি উইকেট হ্যাজলউডের। ২ রানে ফেরেন ওপেনার রায়ান রিকেলটন। ডেভিড বেডিংহাম আউট হন ৪৬ রানে। ১৯ বলের মধ্যে রানে আউট হন বাভুমা ও ত্রিস্তান স্টাবস। বাভুমার উইকেটটি রেনশর, স্টাবসকে ফেরান কামিন্স।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: অস্ট্রেলিয়া: ৩৯০ ও ৩১৪/৬ ডিক্লেয়ার ( রেন শ ৮২, ম্যাডিনসন ৪৮, ওয়েবস্টার ৩৯*, কামিন্স ৩২*, ক্যারি ২৪; নর্কিয়া ২/৫৬, মহারাজ ২/৫৬)। দক্ষিণ আফ্রিকা: ২৮৪ ও ১০২/৪ (বেডিংহাম ৪৬, মার্করাম ৪৫*, রিকেলটন ২; হ্যাজলউড ২/২০, রেন শ ১/১৬)।— চতুর্থ দিন শেষে।
আজ ব্যাটিংয়ে নেমে ৪টি উইকেট না হারালে দক্ষিণ আফ্রিকার কিন্তু প্রেরণা নেওয়ার জায়গা ছিল। ২০০৮ সালে পার্থে এই অস্ট্রেলিয়ারই ৪১৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। টেস্ট ইতিহাসে সেটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের নজির। আজই কয়েক উইকেট পড়ে যাওয়ায় এমন কিছু ঘটানোর ভাবনা থেকে সরতে বাধ্য হয়েছে প্রোটিয়ারা। ডারবান টেস্টের ভাগ্যে আগামীকাল পথ আসলে একটাই—অস্ট্রেলিয়ার জয়। এখান থেকে প্রোটিয়াদের ড্রও অসম্ভব লাগছে কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে সেই চিরকালীন কথাটা তো আছেই— গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা!