ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) বিরুদ্ধে নির্বাচনী অনিয়ম এবং একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিযোগ তুলে কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাহুল গান্ধী ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আরও ১০ নেতার করা আবেদনের শুনানি আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রি বিভাগ ওই আবেদনে মোট ১৪টি ত্রুটি চিহ্নিত করায় এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
আবেদনের ত্রুটিগুলোর মধ্যে দেখা গেছে কোর্ট ফির ক্ষেত্রে ২২০ রুপির ঘাটতি। এছাড়া কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের পরিচয়পত্রের ফটোকপি অস্পষ্ট এবং ১১ জন আবেদনকারীর মধ্যে ৯ জনেরই ওকালতনামা জমা দেওয়া হয়নি। আইনজীবীদের অনুরোধে এই ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হলে আগামীকাল বুধবার আবেদনটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
রেজিস্ট্রি বিভাগের এই আপত্তির কারণে বিরোধী নেতাদের করা জরুরি আবেদনের শুনানি পিছিয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, এই আবেদনের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের কথিত একতরফা সিদ্ধান্তের বিষয়ে একটি স্বাধীন ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত চলাকালীন ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিশেষ কার্যক্রম (এসআইআর) স্থগিত রাখারও আর্জি জানানো হয়েছে। দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলা বিক্ষোভ-সংক্রান্ত ঝুলে থাকা অন্যান্য আবেদনের সঙ্গে এই মামলারও একত্রে শুনানি হওয়ার কথা ছিল।
আবেদনে দেখা গেছে, ৯ জন আবেদনকারীর ওকালতনামা নিখোঁজ। যাঁদের ওকালতনামা জমা পড়েনি, সেই তালিকায় রয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (শরদচন্দ্র পাওয়ার) সংসদ সদস্য সুপ্রিয়া সুলে। এ ছাড়া শিবসেনা (ইউবিটি) সংসদ সদস্য সঞ্জয় রাউত ও তৃণমূল কংগ্রেস সংসদ সদস্য সৌগত রায়ের ওকালতনামাও নথিতে পাওয়া যায়নি।
এছাড়া জনস্বার্থ মামলার মতো একটি রিট আবেদনে কেন ‘ব্যক্তিগত পক্ষদের’ বিবাদী করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রেজিস্ট্রি বিভাগ। মূলত নির্বাচন কমিশনকে প্রধান বিবাদী করার পাশাপাশি তিন নির্বাচন কমিশনারকে ব্যক্তিগতভাবে বিবাদী করায় এই আপত্তি উঠেছে।
এর আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত লোকসভা ও রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা যথাক্রমে রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তাঁদের উদ্বেগগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উত্থাপন করা যেতে পারে এবং আদালতে এলে দ্রুত শুনানির আশ্বাসও দেন।
ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়া ও নির্বাচন কমিশনের কথিত একতরফা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাহুল গান্ধী নিজে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে আবেদনটি জমা দেন। বিরোধী দলের ঐক্য প্রদর্শনের এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে মল্লিকার্জুন খাড়গে ও জোটের অন্য ৯ নেতা উপস্থিত ছিলেন। এই আইনি পদক্ষেপের আগে বিরোধীরা ‘গণতন্ত্রের জন্য মার্চ’ নামের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রায় ৬০০ মিটার দূরে ভগবান দাস রোডে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে মিছিলটি আটকে দেয়। এসআইআর নিয়ে উত্তেজনা ও সিইসি জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে তৈরি হওয়া তীব্র আন্দোলনের মধ্যে এই রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা গেল।
আইনজীবী এস প্রসন্নের মাধ্যমে দায়ের করা এই আবেদনে জ্ঞানেশ কুমারের নেওয়া একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার অনুরোধ করা হয়েছে। মামলায় ভারতের নির্বাচন কমিশন, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীকে বিবাদী করা হয়েছে।
বিরোধী নেতারা জানান, “সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা রক্ষা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার নাগরিক দায়িত্ব থেকেই তাঁরা সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।”
আবেদনকারীরা আরও বলেছেন, “এসআইআরের বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়; বরং এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট স্বীকৃত সুরক্ষাব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশনকে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁরা উদ্বেগ জানিয়েছেন।”