ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর বাতিলের দাবিতে চলমান আন্দোলনে দ্বিতীয় দিনেও আইন অমান্য করে পুনরায় আটক হয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন অশীতিপর কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেসহ বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। গ্রেপ্তারের ঠিক আগ মুহূর্তে রাহুল গান্ধী দাবি করেন, জ্ঞানেশ কুমার একজন অবৈধ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং তাঁর পদত্যাগ করা অপরিহার্য।

রাহুল গান্ধী আরও অভিযোগ করেন, জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন নরেন্দ্র মোদির নির্দেশেই কাজ করছে। তাঁর মতে, "জ্ঞানেশদের নির্বাচন কমিশন যা করছেন, তা নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে। জ্ঞানেশকে শিখণ্ডী করে নরেন্দ্র মোদিই ভারতের গণতন্ত্র ধ্বংস করছেন। যেতে তাঁদের হবেই।"

এর আগে গত মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের অভিযানের সময় পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে আকাশবাণী ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা। সেখানে দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা অবস্থান করার পর পুলিশ তাঁদের আটক করে, তবে দুই ঘণ্টা পর তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।

আজ বুধবার ইন্ডিয়া জোটের নেতারা এক বিশেষ কৌশলে বা গেরিলা কায়দায় যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুপুরে কনট প্লেসের নিকটবর্তী জনপথের সাগর রত্ন রেস্তোরাঁয় বিরোধী নেতাদের মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। সেখান থেকে নির্বাচন সদন ও যন্তর মন্তরের দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটারের কাছাকাছি।

পুলিশের কাছে এই গোপন অভিযানের কোনো আগাম খবর ছিল না এবং ইন্ডিয়া জোটও বিষয়টি প্রকাশ করেনি। তবে জমায়েতের খবর পেয়েই পুলিশ দ্রুত জনপথ এলাকাটি ঘিরে ফেলে। নির্ধারিত সময়ে সেখানে উপস্থিত হন খাড়গে, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়ান ও মহুয়া মৈত্র এবং সিপিএম, আরজেডি ও এনসিপি সহ বিভিন্ন বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা। মধ্যাহ্নভোজের সেই আসরেই যন্তর মন্তরে ধরনা দেওয়ার নতুন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি বাস নিয়ে আসা হয় এবং খাবার শেষ করে বিরোধী নেতারা সেই বাসে ওঠেন। বাসটি জনপথ হয়ে মেরিডিয়েন হোটেলের দিকে এগোতে থাকে। দিল্লি পুলিশ বিভিন্নভাবে বাসটি থামানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। এরপর বাসটি ধীরে ধীরে অশোক রোডে প্রবেশ করে, যেখান থেকে যন্তর মন্তরে ঢোকার পথ সহজ ছিল।

তবে কিছুটা সামনে এগোতেই পুলিশের কঠোর প্রতিরোধের মুখে বাসটি থেমে যায় এবং চাকার হাওয়া ছেড়ে দেওয়া হয়। ততক্ষণে সেখানে কয়েকশ কংগ্রেস কর্মী জড়ো হন। গাড়ি থেকে নেমে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আন্দোলনকারীদের ভিড়ে মিশে যন্তর মন্তরের দিকে হাঁটতে শুরু করেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই পুলিশ তাঁদের আটক করে।

আটকের সেই প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। একদিকে ‘ভোটচুরি’র বিরুদ্ধে বিরোধীদের তীব্র স্লোগান এবং অন্যদিকে পুলিশের তৎপরতা। তবে কোনো নেতা-নেত্রীর যেন শারীরিক আঘাত না লাগে, সে বিষয়ে পুলিশের প্রতি কড়া নির্দেশ ছিল। গ্রেপ্তারি এড়াতে এক পর্যায়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী মাটিতে শুয়ে পড়েন এবং রাহুল গান্ধী রাস্তায় বসে পড়েন। ফলে তাঁদের পাঁজাকোলা করে বাসে তুলতে পুলিশকে যথেষ্ট হিমশিম খেতে হয়। তখন সন্ধ্যা ছয়টা বাজে এবং চারপাশ অন্ধকারে ডুবে আসছিল, পুরো এলাকাটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।

রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাসহ বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ অসংখ্য এফআইআর দায়ের করেছে। এই বিষয়ে গ্রেপ্তারের আগে গণমাধ্যমকে রাহুল গান্ধী বলেন, “শুনেছি, আমার বিরুদ্ধে নাকি চার ডজন এফআইআর করা হয়েছে। এতে কিছু যায় আসে না। আমি চাই, ১০০ এফআইআর হোক। প্রতিটি এফআইআর আমার মেডেল। ইস্তফা না নেওয়া ও এসআইআর বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।”

জোট সূত্রে জানা গেছে, ইন্ডিয়া জোট আগামী দিনেও এই আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। আগামী ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তর অভিযানের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তাদের নেতাদের দাবি, ওই দিন পুলিশ আন্দোলনকারীদের যেখানে আটক করবে, সেই স্থানটিই হয়ে উঠবে যন্তর মন্তর।

সিজেপির এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্রসংগঠন। বুধবার দিল্লি প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস জানান, জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা দিলেও তাঁদের আন্দোলন থামবে না। নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন না করা পর্যন্ত এই লড়াই চলবে, কারণ তাঁর দাবি, ওই কমিশনের দৌলতেই নরেন্দ্র মোদিরা ক্ষমতায় টিকে আছেন।

ওই সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির পাশাপাশি সিপিএমের এসএফআই, সিপিআইএর এআইএসএফ, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের এআইএসএ (আইসা) এবং আম আদমি পার্টির ছাত্রসংগঠন এএসএপি যোগ দেয়।

আইসা নেত্রী সেখানে স্পষ্টভাবে জানান, “নির্বাচন কমিশনবিরোধী এই আন্দোলনে পড়ুয়াদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে বিরোধীদের বিক্ষোভের কোনো বিরোধ নেই। এই লড়াইয়ে একদিকে রয়েছি আমরা সবাই, যারা ভারতের জনগণ; অন্যদিকে বিজেপি। এই লড়াই আমরা একজোট হয়ে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে যাব।”

এদিকে দেশজুড়ে অপসারণের দাবির মুখে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তাঁর ছত্তিশগড় সফর বাতিল করেছেন। বুধবার দুই দিনের সফরে কমিশনের অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। তবে বিজেপিশাসিত ওই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক জানিয়েছেন, অনিবার্য কারণে সফরটি স্থগিত করা হয়েছে।

এর আগে বিরোধী আন্দোলনের শুরুতেই জ্ঞানেশ কুমার উত্তর প্রদেশের বেরিলি ও বারানসি সফর বাতিল করেন। এরপর লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখন্ড সফরও বাতিল করা হয়।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে জ্ঞানেশ কুমার জনরোষের মুখে পড়তে চাইছেন না। দেশজুড়ে তীব্র বিরোধিতার মুখে তাঁকে আপাতত দিল্লি ছেড়ে অন্য কোথাও না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।