ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি। গতকাল রোববার গভীর রাতে একটি ই-মেইল বার্তার মাধ্যমে কংগ্রেস নেতৃত্বকে তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সূর্যকান্ত জানান, কেন তিনি এই সাক্ষাৎ করতে রাজি নন, সেই বিষয়ে ই-মেইল বার্তায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।

মূলত ভোটার তালিকায় বেআইনিভাবে নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রম পরিচালনা, কোটি কোটি ভোটারের নাম বাতিল করা এবং এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ জানাতে আজ সোমবার সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন ইন্ডিয়া জোটের প্রতিনিধিরা।

এই সাক্ষাতের অনুরোধ জানিয়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং রাহুল গান্ধী প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠির প্রেক্ষিতেই ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সোমবারের জন্য একটি কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছিলেন। তবে রোববার রাতে ই-মেইল পাঠিয়ে সূর্যকান্ত তাঁদের সঙ্গে দেখা না করার সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেন।

দেখা করতে না চাওয়ার পেছনে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, তিনি জানিয়েছেন, একজন বিচারপতি হিসেবে তাঁর মূল দায়িত্ব হলো শুনানির ব্যবস্থা করা এবং মামলার নিষ্পত্তি করা। যেহেতু নির্বাচন কমিশনের এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক মামলা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, তাই আদালতের বাইরে নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, আদালতকে রাজনীতির আঙিনায় টানা উচিত নয়।

দ্বিতীয়ত, তিনি উল্লেখ করেন যে সংবিধান অনুযায়ী আইনসভা, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের কাজের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। বিচার বিভাগ কোনোভাবেই আইনসভা বা প্রশাসনিক বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে না। এই ধরনের অভিযোগ বিবেচনার এখতিয়ারও বিচার বিভাগের নেই।

তৃতীয়ত, প্রধান বিচারপতি জানান, আইন পর্যালোচনার পূর্ণ অধিকার বিচার বিভাগের রয়েছে এবং সব বিষয় পর্যালোচনার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের আছে। তাই জোট নেতারা তাঁদের যাবতীয় অভিযোগ পর্যালোচনার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানাতে পারেন। সেক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে সেই আবেদন শুনতে তিনি প্রস্তুত। সূর্যকান্ত আরও জানান, আজ সোমবার বিকেল চারটার মধ্যে তেমন কোনো আবেদন জমা পড়লে তিনি তা বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেবেন।

চতুর্থত, দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আদালত দায়বদ্ধ। ই-মেইল বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, নাগরিকদের অভিযোগ শোনার জন্য তাঁর দরজা সব সময় উন্মুক্ত।

ইন্ডিয়া জোটের এই কর্মসূচি বেশ কয়েক দিন আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছিল। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রতিকারের আশায় রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতি—উভয়ের সাথেই দেখা করবেন জোট নেতারা। আজ সূর্যকান্তর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা ছিল। এজন্য বিরোধী নেতারা পরিকল্পনা করেছিলেন, সোমবার ইন্ডিয়া গেটের কাছে জড়ো হয়ে তাঁরা হেঁটে সুপ্রিম কোর্টে যাবেন।

প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত দেখা করতে রাজি না হওয়া সত্ত্বেও ইন্ডিয়া জোটের নেতারা তাঁদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি পরিবর্তন করছেন না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেলা দেড়টায় কনস্টিটিউশন ক্লাবে বিরোধী নেতারা সমবেত হবেন এবং সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পদযাত্রা শুরু করবেন। পদযাত্রার আগে রাহুল গান্ধী গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন বলে জানা গেছে।

সোমবারও আন্দোলনকারীদের রুখতে তৎপর দিল্লি পুলিশ, তবে আগের দিনগুলোর মতো খুব বেশি কড়াকড়ি করা হচ্ছে না। এর আগে দিল্লি পুলিশ ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছিল, কিন্তু সোমবার সকাল থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত মাত্র ৬টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু সড়ক থেকে ব্যারিকেডও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের এই শিথিলতার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, সোমবার সাধারণ কাজের দিন হওয়ায় অফিস যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে পুলিশকে। দ্বিতীয়ত, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বিক্ষোভের ক্ষেত্রে পুলিশকে মাত্রাছাড়া কড়াকড়ি না করার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই নির্দেশ অমান্য করার কারণে পুলিশ, মেট্রো ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট নোটিশ জারি করেছে। এই পরিস্থিতির কারণে সোমবার পুলিশ তেমন কড়াকড়ি করছে না।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ প্রদর্শন করা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এবং তা রক্ষা করতে হবে। এই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্ব আজ পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যাবেন। আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস, রত্না সিংসহ সিজেপি নেতারা জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য পুলিশের কাছে সময় চাইবেন। তাঁরা দাবি জানাবেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের এই অনুমতি দেওয়া হোক, অন্যথায় তাঁরা পুনরায় আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হবেন।