বাঙালিদের খাদ্যতালিকায় দই অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পরিচিত একটি খাবার। দুপুরের খাবারের সাথে যেমন দই থাকে, তেমনি মিষ্টির কারুকাজ কিংবা লাচ্ছি তৈরিতেও এর ব্যাপক ব্যবহার হয়। অনেকে বাড়িতেই দই পাতেন, আবার অনেকে বাজার থেকে কিনে এনে ফ্রিজে সংরক্ষণ করেন এবং কয়েক দিন ধরে তা খান। তবে আমাদের দেশের গরম আবহাওয়ায় দই খুব দ্রুত টক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। অনেক সময় দেখা যায় দইয়ের ওপর পানি জমেছে অথবা এর স্বাদে ও গন্ধে পরিবর্তন এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই দই কি খাওয়া নিরাপদ?

মূলত দই একটি গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি দুগ্ধজাত খাবার। এতে বিদ্যমান উপকারী ব্যাকটেরিয়া দুধের ল্যাকটোজকে ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে, আর এই প্রক্রিয়ার কারণেই দইয়ের স্বাদে টক ভাব আসে। তাপমাত্রা বেশি থাকলে এই গাঁজন প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর হয়। তাই দইয়ের গুণমান ও স্বাদ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

ফ্রিজে কত দিন দই রেখে খাওয়া যায়

দই কতদিন ভালো থাকবে তা মূলত নির্ভর করে দইটি বাড়িতে তৈরি নাকি বাজার থেকে কেনা তার ওপর। এছাড়া দই তৈরির পদ্ধতি, সংরক্ষণের ধরন এবং ফ্রিজের তাপমাত্রার ওপরও এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে।

বাড়িতে তৈরি দই: পরিষ্কার পাত্রে দই তৈরি করে দ্রুত ফ্রিজে রাখা উচিত। এর স্বাদ ও মান ধরে রাখতে ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে খেয়ে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। তবে কেবল দিনের হিসাব দিয়ে দই নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

বাজারের প্যাকেটজাত দই: এই ধরনের দইয়ের ক্ষেত্রে প্যাকেটে লেখা মেয়াদের তারিখ, সংরক্ষণবিধি এবং প্যাকেট খোলার পর কতদিন ব্যবহার করা যাবে, সেই বিষয়ে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।

প্যাকেট খোলার পর: প্যাকেট খোলার পর দইটি ঢেকে ফ্রিজে রাখতে হবে এবং অবশ্যই পরিষ্কার চামচ ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া খোলার পর সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা থাকলে তা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্য নিরাপত্তা নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, সাধারণ দই ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম তাপমাত্রায় ফ্রিজে প্রায় এক থেকে দুই সপ্তাহ রাখা যেতে পারে। তবে এই সময়সীমা সব ধরনের ঘরে তৈরি দইয়ের জন্য প্রযোজ্য নয়। দইয়ের ধরন, প্রস্তুতপ্রণালি এবং সংরক্ষণের পরিবেশ অনুযায়ী এর স্থায়িত্ব ভিন্ন হতে পারে।

দই দ্রুত টক হয়ে যাওয়ার কারণ

দই টক হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর গাঁজন প্রক্রিয়া। দই তৈরির সময় উপকারী ব্যাকটেরিয়া দুধের শর্করা ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে, যার ফলে দই টক হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে ব্যাকটেরিয়ার এই কার্যক্রম আরও দ্রুত হয়। ফলে দই জমে যাওয়ার পর বাইরে রেখে দিলে তা আরও বেশি টক হয়ে যায়। এছাড়া গরম আবহাওয়া, বারবার ফ্রিজ থেকে বের করা, ঠিকমতো ঢেকে না রাখা এবং অপরিষ্কার চামচ ব্যবহারের কারণে দইয়ের গুণমান দ্রুত নষ্ট হতে পারে।

দই ভালো রাখার ৬টি কার্যকর নিয়ম

১. দই জমে গেলে দ্রুত ফ্রিজে রাখুন: বাড়িতে দই পাতার পর তা জমে গেলে ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখবেন না। পরিষ্কার ও ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রেখে দ্রুত ফ্রিজে দিন। এতে গাঁজনের গতি ধীর হবে এবং দই অতিরিক্ত টক হওয়ার সম্ভাবনা কমবে। মনে রাখা প্রয়োজন, দই তৈরির জন্য উষ্ণ পরিবেশ দরকার হলেও জমে যাওয়ার পর সেটিকে দীর্ঘ সময় গরম জায়গায় রাখা উচিত নয়।

২. ঢাকনাযুক্ত পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করুন: দই সংরক্ষণের জন্য পরিষ্কার এবং খাবার রাখার উপযোগী ঢাকনাযুক্ত পাত্র ব্যবহার করুন। ঢাকনা থাকলে বাইরের ধুলাবালি বা অন্য খাবারের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমে। পাত্রটি ব্যবহারের আগে ভালোভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিন। দইয়ের মধ্যে হাত বা ব্যবহৃত চামচ বারবার প্রবেশ করাবেন না।

৩. ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক রাখুন: দইসহ পচনশীল খাবার সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম রাখা শ্রেয়। তাপমাত্রা বেশি হলে খাবারে জীবাণু বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের গরম আবহাওয়ায় রান্নাঘর বা খাবার টেবিলে দই দীর্ঘক্ষণ রাখলে তা দ্রুত নষ্ট হতে পারে।

৪. প্রতিবার পরিষ্কার ও শুকনো চামচ ব্যবহার করুন: দই নেওয়ার সময় সবসময় পরিষ্কার চামচ ব্যবহার করুন। চামচটি যদি অপরিষ্কার থাকে বা তাতে অন্য খাবারের অংশ, পানি বা ময়লা থাকে, তবে দই দূষিত হতে পারে। একই চামচ দিয়ে দই খাওয়া এবং সেই চামচটি পুনরায় মূল পাত্রে ঢোকানোর অভ্যাস পরিহার করুন। পাত্র থেকে প্রয়োজনমতো অংশ আলাদা করে নিলে মূল দই বারবার বাইরে বের করতে হয় না।

৫. বারবার ফ্রিজ থেকে বের করবেন না: প্রয়োজন অনুযায়ী দই বের করে বাকি অংশ দ্রুত ফ্রিজে ফিরিয়ে রাখুন। দীর্ঘ সময় বাইরে রাখলে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যা দইয়ের গুণমান ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। সাধারণ খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী, পচনশীল খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি রাখা উচিত নয়। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে এই সময়সীমা এক ঘণ্টা। এর চেয়ে বেশি সময় বাইরে থাকলে দই ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।

৬. দইয়ের গন্ধ, রং ও গঠন খেয়াল করুন: দইয়ের স্বাভাবিক হালকা টক গন্ধ থাকতে পারে। তবে যদি তীব্র দুর্গন্ধ, অস্বাভাবিক রং, ছাঁচ বা গঠনে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়, তবে তা খাবেন না। দইয়ের ওপর কিছুটা পানি জমা মানেই দই নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়; এটি দই থেকে আলাদা হওয়া তরল হতে পারে। তবে শুধু দেখে বা গন্ধ শুঁকে দই নিরাপদ কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। সংরক্ষণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে স্বাদ পরীক্ষা না করে ফেলে দেওয়াই ভালো।

টক হয়ে যাওয়া দই কি খাওয়া যায়?

স্বাভাবিক গাঁজন প্রক্রিয়ার কারণে দই সামান্য টক হতে পারে। যদি দই সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়, মেয়াদের মধ্যে থাকে এবং নষ্ট হওয়ার কোনো লক্ষণ না থাকে, তবে তা খাওয়ার উপযোগী।

কিন্তু দই যদি দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকে, সংরক্ষণের ইতিহাস জানা না থাকে অথবা তাতে ছাঁচ, অস্বাভাবিক রং বা দুর্গন্ধ দেখা দেয়, তবে তা খাওয়া একদম উচিত নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, নষ্ট দই রান্নায় ব্যবহার করলেই তা নিরাপদ হয়ে যাবে, এমন কোনো কথা নেই।

দই দ্রুত টক হওয়া রোধ করতে সঠিক তাপমাত্রা, পরিষ্কার পাত্র এবং ফ্রিজের বাইরে কম সময় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে তৈরি দই কয়েক দিনের মধ্যে খেয়ে নেওয়া এবং বাজারের দইয়ের ক্ষেত্রে প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। মনে রাখবেন, দই টক হলেই যে নষ্ট, তা নয়; আবার দেখতে ঠিকঠাক থাকলেই যে নিরাপদ, তা-ও নয়। সংরক্ষণের পদ্ধতি, সময় ও তাপমাত্রা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন। সন্দেহ হলে দই ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।

সূত্র: নিউজ ১৮