রাতে ঘুমানোর সময় অনেকেই আরাম পেতে বা অভ্যাসবসত পাশ ফিরে শুতে পছন্দ করেন। তবে এভাবে শুয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠে কোমর, নিতম্ব বা হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করেন কেউ কেউ। ঘুমানোর ভঙ্গিতে সামান্য পরিবর্তন এই অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এমনই একটি সহজ উপায় হলো দুই পায়ের মাঝে একটি বালিশ রেখে ঘুমানো।

স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইনের তথ্য অনুযায়ী, পাশ ফিরে শোয়ার সময় হাঁটু বা উরুর মাঝখানে বালিশ কোমর, নিতম্ব ও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখতে পারে। এতে শরীরের কিছু অংশে অতিরিক্ত চাপ কমে এবং কারও কারও কোমর ও নিতম্বের ব্যথায়ও আরাম মিলতে পারে।

তবে এই অভ্যাস সবার জন্য সমান উপকারী না। বালিশের আকার, ঘুমানোর ভঙ্গি এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর এর উপকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে।

দুই পায়ের মাঝে বালিশ রেখে ঘুমালে কী হয়

পাশ ফিরে ঘুমানোর সময় ওপরের পা সামনের দিকে সরে গেলে নিতম্ব ও শ্রোণির অবস্থান কিছুটা ঘুরে যায়। এর ফলে কোমরের মেরুদণ্ডেও টান পড়তে পারে। দুই হাঁটুর মাঝে বালিশ রাখলে ওপরের পা অতিরিক্ত নিচে নেমে যাওয়া বা সামনে সরে যাওয়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

এতে নিতম্ব ও মেরুদণ্ডের অবস্থান তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকে। বিশেষ করে যারা কোমর বা নিতম্বের অস্বস্তির কারণে রাতে বারবার ঘুম থেকে উঠে পড়েন, তাদের জন্য এভাবে ঘুমানো আরামদায়ক হতে পারে।

তবে মনে রাখবেন, এই পদ্ধতিতে সবার ক্ষেত্রে একই রকম উপকার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এটি মূলত আরাম ও শরীরের অবস্থান ঠিক রাখতে সহায়ক একটি উপায় মাত্র।

দুই পায়ের মাঝে বালিশ রাখার ৫টি সম্ভাব্য উপকার

কোমরের ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে: পাশ ফিরে ঘুমানোর সময় দুই পায়ের অবস্থানের কারণে নিতম্ব ও কোমরে টান পড়তে পারে। হাঁটুর মাঝে বালিশ রাখলে পায়ের অবস্থান স্থিতিশীল থাকে এবং মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য হতে পারে।

এর ফলে কিছু মানুষের কোমরের পেশি ও আশপাশের টিস্যুর ওপর চাপ কমতে পারে। তবে কোমরের ব্যথার কারণ যদি অন্য কোনো রোগ বা আঘাত হয়, তাহলে শুধু বালিশ ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।

নিতম্বের অস্বস্তি কমাতে পারে: ঘুমানোর সময় নিতম্বের ওপর চাপ পড়লে কারও কারও ব্যথা বা অস্বস্তি বাড়ে। দুই পায়ের মাঝে বালিশ রাখলে পায়ের অবস্থান কিছুটা স্থিতিশীল হয়। এতে নিতম্বের ওপর চাপ কম অনুভূত হতে পারে।

বিশেষ করে পাশ ফিরে ঘুমানোর সময় দুই হাঁটু সরাসরি একে অপরের সঙ্গে ঘষা লাগলে বালিশ অতিরিক্ত চাপ ও অস্বস্তি কমাতেও সাহায্য করতে পারে।

মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করে: ঘুমানোর সময় শরীরের অবস্থান ঠিক না থাকলে কোমর ও নিতম্বে টান তৈরি হতে পারে। হাঁটুর মাঝে উপযুক্ত উচ্চতার বালিশ রাখলে শ্রোণি ও মেরুদণ্ডের অবস্থান তুলনামূলক স্বাভাবিক রাখা সহজ হয়।

তবে শুধু বালিশ ব্যবহার করলেই মেরুদণ্ডের সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। ঘুমানোর সামগ্রিক ভঙ্গি, বিছানার আরাম এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

সায়াটিকার ব্যথায় কিছুটা আরাম দিতে পারে: সায়াটিকা হলো এমন একটি সমস্যা, যেখানে সায়াটিক স্নায়ুতে চাপ বা জ্বালাপোড়ার কারণে কোমর বা নিতম্ব থেকে পায়ের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে যেতে পারে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পাশ ফিরে ঘুমানোর সময় হাঁটুর মাঝে বালিশ রাখলে কোমর ও নিতম্বের অবস্থান ঠিক রাখতে সাহায্য হয়। এতে অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে।

তবে সায়াটিকার কারণ ও তীব্রতা ব্যক্তিভেদে আলাদা। কোনো বিশেষ ঘুমের ভঙ্গিতে ব্যথা বাড়লে সেটি জোর করে বজায় রাখা উচিত নয়।

গর্ভাবস্থায় ঘুমাতে আরাম হতে পারে: গর্ভাবস্থার শেষের দিকে শরীরের আকার ও ওজনের পরিবর্তনের কারণে ঘুমানোর সময় কোমর, নিতম্ব ও পায়ে অস্বস্তি হতে পারে। পাশ ফিরে শোয়ার সময় দুই হাঁটুর মাঝে বালিশ রাখলে পায়ের অবস্থান ঠিক রাখতে এবং আরাম পেতে সাহায্য হতে পারে।

প্রয়োজনে পেটের নিচে বা শরীরের পেছনেও অতিরিক্ত বালিশ ব্যবহার করা যায়। তবে গর্ভাবস্থায় ঘুমানোর অবস্থান নিয়ে চিকিৎসকের বিশেষ নির্দেশনা থাকলে সেটিই অনুসরণ করতে হবে।

কীভাবে দুই পায়ের মাঝে বালিশ রেখে ঘুমাবেন?

বালিশের উপকার পেতে সঠিকভাবে এর ব্যবহার জরুরি। এরক্ষত্রে কয়েকটি সহজ নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন।

প্রথমে এক পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ুন।

হাঁটু সামান্য বাঁকিয়ে আরামদায়ক অবস্থানে রাখুন। হাঁটু বুকের সঙ্গে অতিরিক্ত চেপে ধরার প্রয়োজন নেই।

দুই হাঁটুর মাঝখানে এমন একটি বালিশ রাখুন, যাতে ওপরের পা নিচের পায়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেয়।

বালিশের উচ্চতা এমন হওয়া উচিত, যাতে নিতম্ব অস্বাভাবিকভাবে ওপরে উঠে না যায় বা নিচের দিকে ঝুঁকে না পড়ে।

পাশ ফিরে শোয়ার সময় মাথার নিচের বালিশও ঠিকমতো ব্যবহার করুন। মাথা যেন অতিরিক্ত নিচে নেমে না যায় বা বেশি ওপরে উঠে না থাকে।

বালিশের কারণে অস্বস্তি, ব্যথা বা ঘুমের সমস্যা হলে এর অবস্থান পরিবর্তন করুন। প্রয়োজনে অন্য ভঙ্গি চেষ্টা করুন।

বালিশ খুব পাতলা হলে পায়ের মাঝখানে যথেষ্ট সমর্থন নাও পাওয়া যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত মোটা বা শক্ত বালিশ নিতম্বের অবস্থান অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে। তাই নিজের শরীরের সঙ্গে মানানসই বালিশ বেছে নেওয়াই ভালো।

পাশ ফিরে না শুলেও কি বালিশ ব্যবহার করা যায়?

হ্যাঁ। যারা চিৎ হয়ে ঘুমাতে পছন্দ করেন, তারা হাঁটুর নিচে বালিশ রাখতে পারেন। এতে হাঁটু সামান্য বাঁকানো থাকে এবং কোমরের ওপর চাপ কম অনুভূত হতে পারে।

তবে দুই পায়ের মাঝখানে বালিশ রাখা এবং হাঁটুর নিচে বালিশ রাখা এক বিষয় নয়। কোন পদ্ধতি বেশি আরামদায়ক হবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির ঘুমানোর অভ্যাস ও শারীরিক সমস্যার ওপর।

কোমর বা নিতম্বের দুই পাশেই ব্যথা থাকলে পাশ ফিরে শোয়ার পরিবর্তে চিৎ হয়ে হাঁটুর নিচে বালিশ রেখে ঘুমানো কারও কারও জন্য বেশি আরামদায়ক হতে পারে। যে অবস্থানে ব্যথা বাড়ে, সেভাবে শোয়া এড়িয়ে চলুন।

দুই পায়ের মাঝে বালিশ রাখলে কি কোনো ক্ষতি হতে পারে

সাধারণভাবে দুই পায়ের মাঝে বালিশ রেখে ঘুমানো নিরাপদ। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই অভ্যাস অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

ভুল উচ্চতার বালিশ: অতিরিক্ত উঁচু বা শক্ত বালিশ নিতম্ব ও কোমরের অবস্থান অস্বাভাবিক করে দিতে পারে। ফলে সকালে ব্যথা বা শক্তভাব অনুভূত হতে পারে।

আগে থেকেই কোমর বা নিতম্বে ব্যথা: যাদের শরীরের দুই পাশেই ব্যথা রয়েছে, তাদের জন্য পাশ ফিরে শোয়া আরামদায়ক নাও হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে অন্য ঘুমের ভঙ্গি চেষ্টা করা যেতে পারে।

ব্যথা বেড়ে যাওয়া: বালিশ ব্যবহার করার পর ব্যথা বা অস্বস্তি বাড়লে সেটি ব্যবহার বন্ধ করে অন্য ভঙ্গি চেষ্টা করুন।

চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার: দীর্ঘস্থায়ী কোমর বা পায়ের ব্যথাকে শুধু ঘুমের ভঙ্গির সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ব্যথার কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

ঘুমের ভঙ্গি পরিবর্তন করেও যদি কোমর, নিতম্ব বা পায়ের ব্যথা না কমে, কিংবা ব্যথার কারণে ঘুম ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পায়ের দুর্বলতা নতুন করে দেখা দিলে, কুঁচকি বা নিতম্বের মাঝের অংশে অনুভূতি কমে গেলে কিংবা প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে হঠাৎ সমস্যা হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এগুলো স্নায়ুর গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

ঘুমানোর সময় দুই পায়ের মাঝে বালিশ রাখা একটি সহজ অভ্যাস, যা শরীরের অবস্থান ঠিক রাখতে এবং কিছু মানুষের কোমর ও নিতম্বের অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সবার জন্য একই পদ্ধতি কার্যকর হবে না। বালিশের উচ্চতা ও দৃঢ়তা নিজের শরীরের সঙ্গে মানানসই হওয়া জরুরি।

ঘুমের সময় আরাম পাওয়া এবং ব্যথামুক্ত থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো ভঙ্গিতে অস্বস্তি হলে সেটি পরিবর্তন করুন। আর ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু বালিশের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র: হেল্থলাইন