মাথাব্যথা, জ্বর কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যায় আমাদের প্রায়ই ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ওষুধ খাওয়ার সময় আমরা অনেকেই কিছু সাধারণ নিয়ম মানি না। কেউ এক ঢোঁক পানি দিয়ে ট্যাবলেট গিলে ফেলি, আবার কেউ সকালে চা বা দুধ খাওয়ার সময়ই ওষুধ খেয়ে নিই। অনেকে আবার ওষুধ খেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই শুয়ে পড়েন।
এসব অভ্যাসের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল খেলে অনেক সময় তা গলা কিংবা খাদ্যনালিতে আটকে যেতে পারে। কিছু ওষুধ খাদ্যনালিতে আটকে গেলে জ্বালাপোড়া, ব্যথা বা ক্ষতও তৈরি করতে পারে।
তাহলে ওষুধ খাওয়ার সময় কতটা পানি পান করা উচিত? চা বা দুধ দিয়ে ওষুধ খাওয়া কি নিরাপদ? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
ওষুধ খাওয়ার সময় কতটা পানি প্রয়োজন
সাধারণ ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত সাধারণ পানি পান করা ভালো। এতে ওষুধ গিলতে সুবিধা হয় এবং তা খাদ্যনালি দিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
ওষুধ খাওয়ার সময় অন্তত ৬০ মিলিলিটার পানি ব্যবহারের কথা বলা হয় বিভিন্ন গবেষণায়। তবে সব ওষুধের জন্য এটিই যথেষ্ট বা নির্দিষ্ট পরিমাণ না। অনেক সাধারণ ট্যাবলেট ও ক্যাপসুলের ক্ষেত্রে এক গ্লাস পানি, অর্থাৎ আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি ব্যবহার করাই স্বাভাবিক অভ্যাস হতে পারে। তবে ওষুধের নির্দেশিকা অনুযায়ী পানির পরিমাণ ঠিক করা উচিত।
কিছু ওষুধ খালি পেটে, কিছু খাবারের সঙ্গে এবং কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণ পানির সঙ্গে নিয়ম অনুযায়ী খেতে হয়। তাই ওষুধের প্যাকেটের নির্দেশনা পড়া গুরুত্বপূর্ণ। দরকার হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।
চা বা দুধ দিয়ে কি ওষুধ খাওয়া ঠিক
অনেকেই চা, কফি বা দুধের সঙ্গে ওষুধ খেয়ে নেন। কিন্তু মনে রাকতে হবে, সব ওষুধের ক্ষেত্রে এটি নিরাপদ না।
দুধের ক্যালসিয়াম কিছু ওষুধের শোষণের জন্য বাধার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে দুধ বা ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবারের সঙ্গে ওষুধ খাওয়ার ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান জরুরি। আবার চা ও কফির ক্যাফেইনও কিছু ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।
তবে সব ওষুধের ক্ষেত্রে চা বা দুধ নিষিদ্ধ না। কোন ওষুধ কীভাবে খেতে হবে, তা নির্ভর করে ওষুধটির ধরন ও নির্দেশনার ওপর। চিকিৎসক বিশেষভাবে অন্য কিছু না বললে সাধারণ পানি দিয়ে ওষুধ খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।
ওষুধ খেয়েই শুয়ে পড়বেন না
ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লে কিছু ওষুধ খাদ্যনালিতে আটকে থাকার ঝুঁকি থাকে। এর ফলে বুক জ্বালাপোড়া, গিলতে ব্যথা হওয়া কিংবা খাদ্যনালিতে প্রদাহ হয়।
বিশেষ করে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, অস্টিওপোরোসিসের ওষুধ এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট ওষুধের ক্ষেত্রে খাওয়ার পর কতক্ষণ সোজা হয়ে দাড়িয়ে বা বসে থাকতে হবে, তার আলাদা নির্দেশনা থাকে। তাই ওষুধের নির্দেশিকায় যা আছে তা মেনে চলুন।
সাধারণভাবে ওষুধ খাওয়ার সময় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা এবং পানি দিয়ে ভালোভাবে গিলে নেওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক। কোনো ওষুধ খাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় শুয়ে না থাকার নির্দেশ থাকলে তা অবশ্যই অনুসরণ করা উচিত।
ট্যাবলেট গুঁড়ো করে বা ক্যাপসুল খুলে খাওয়া কি নিরাপদ?
কোনো ট্যাবলেট বড় হওয়ায় গিলতে অসুবিধা হলে অনেকে সেটি গুঁড়ো করে খান। আবার কেউ কেউ ক্যাপসুল খুলে সেটার ভেতরের গুঁড়ো আলাদা করে বেড় করে খেয়ে নেন। কিন্তু চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ ছাড়া এভাবে ওষুধের ধরন পরিবর্তন করা ঠিক না।
কিছু ট্যাবলেট বিশেষ আবরণযুক্ত হয়। এ আবরণ ওষুধ ধীরে ধীরে শরীরে ছাড়তে বা পাকস্থলীর বদলে অন্ত্রে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এগুলো গুঁড়ো করলে ওষুধের কার্যকারিতা বদলে যেতে পারে বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ক্যাপসুল বা ট্যাবলেট গিলতে সমস্যা হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। প্রয়োজনে একই ওষুধের তরল বা সহজে গেলা যায় এমন বিকল্প আছে কি না জেনে নিন।
ওষুধ খাওয়ার সময় আরও যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
নির্ধারিত নিয়ম মেনে ওষুধ খান: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা ও সময় বজায় রাখুন।
ওষুধের নির্দেশিকা পড়ুন: কোনো ওষুধ খাবারের আগে, পরে বা নির্দিষ্ট পানির সঙ্গে খেতে হতে পারে।
নিজের ইচ্ছায় ওষুধের মাত্রা বদলাবেন না: দ্রুত সুস্থ হওয়ার আশায় বেশি ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
পানি গিলতে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: খাবার বা পানীয় গিলতেও অসুবিধা হলে জোর করে ট্যাবলেট গেলার চেষ্টা করবেন না।
ওষুধ আটকে যাওয়ার লক্ষণ অবহেলা করবেন না: ওষুধ খাওয়ার পর বুক বা গলায় ব্যথা, গিলতে অসুবিধা কিংবা বারবার অস্বস্তি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শ্বাস নিতে সমস্যা হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
ওষুধ খাওয়ার নিয়ম ছোট বিষয় মনে হলেও তা ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার এবং কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সাধারণ পানি ব্যবহার করুন। চা, কফি বা দুধ দিয়ে ওষুধ খাওয়ার আগে নির্দেশনা যাচাই করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ট্যাবলেট গুঁড়ো বা ক্যাপসুল খুলবেন না।
মনে রাখবেন, সব ওষুধের নিয়ম এক নয়। তাই নিজের ওষুধের প্যাকেটে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
সূত্র: টিভি ৯