সকালের নাশতায় অনেকেই দুধ ও কলা খেতে পছন্দ করেন। কেউ সরাসরি দুধের সঙ্গে কলা খান, আবার কেউ কলা দিয়ে মিল্কশেক তৈরি করেন। সহজে তৈরি করা যায় বলে এই খাবার ব্যস্ত দিনের নাশতা কিংবা শরীরচর্চার পর খাওয়ার জন্যও জনপ্রিয়।

তবে দুধ ও কলা একসঙ্গে খাওয়া নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। কেউ মনে করেন, এই দুই খাবার একসঙ্গে খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে। আবার আয়ুর্বেদের কিছু খাদ্যবিধিতেও দুধ ও কলার সংমিশ্রণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কিন্তু আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান কী বলছে? দুধ ও কলা একসঙ্গে খেলে কি সত্যিই শরীরের ক্ষতি হয়, নাকি এই ধারণার পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই?

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও উপলব্ধ গবেষণা অনুযায়ী, দুধ ও কলা একসঙ্গে খেলে শরীরে বিষক্রিয়া হয় বা এই সংমিশ্রণ সবার জন্য ক্ষতিকর, এমন দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে কারও হজমের সমস্যা, দুধে অসহিষ্ণুতা অথবা খাবারের পরিমাণের কারণে অস্বস্তি হতে পারে।

দুধ ও কলা একসঙ্গে খেলে কী কী পুষ্টি পাওয়া যায়?

দুধ ও কলা দুটিই পুষ্টিকর খাবার। একসঙ্গে খেলে শরীর বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান পেতে পারে।

কলার পুষ্টিগুণ

পটাশিয়াম: শরীরের পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজ এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

ভিটামিন বি৬: শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজে এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাহায্য করে।

কার্বোহাইড্রেট: শরীরের শক্তির অন্যতম উৎস।

খাদ্যআঁশ: হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

দুধের পুষ্টিগুণ

প্রোটিন: পেশি গঠন ও শরীরের কোষের ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে।

ক্যালসিয়াম: হাড় ও দাঁত মজবুত রাখতে প্রয়োজন।

ভিটামিন বি১২: রক্তকণিকা তৈরি ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।

অন্যান্য পুষ্টি উপাদান: দুধের ধরন অনুযায়ী এতে ভিটামিন ডি ও ফসফরাসও পাওয়া যেতে পারে।

তাই দুধ ও কলা একসঙ্গে খেলে শক্তি, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও খাদ্যআঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।

দুধ ও কলা একসঙ্গে খেলে কি হজমের সমস্যা হয়?

দুধ ও কলা একসঙ্গে খেলেই হজমের সমস্যা হবে, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই খাবার খাওয়ার পর পেট ভার লাগা, গ্যাস বা অস্বস্তি হতে পারে। এর কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ আছে।

ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা

দুধে ল্যাকটোজ নামের এক ধরনের শর্করা থাকে। কারও শরীরে এই শর্করা হজম করার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাকটেজ এনজাইমের ঘাটতি থাকলে দুধ খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটব্যথা কিংবা ডায়রিয়া হতে পারে। একে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বলা হয়।

একসঙ্গে বেশি খাবার খাওয়া

এক গ্লাস দুধের সঙ্গে একাধিক কলা, চিনি, মধু বা আইসক্রিম মিশিয়ে বড় এক গ্লাস মিল্কশেক তৈরি করলে মোট খাবারের পরিমাণ ও ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে। এতে কারও কারও পেট ভার লাগতে পারে।

ব্যক্তিভেদে হজমের পার্থক্য

একই খাবার সবার শরীরে একইভাবে সহ্য হয় না। তাই দুধ ও কলা একসঙ্গে খাওয়ার পর বারবার অস্বস্তি হলে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে বা আলাদা সময়ে খেয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যেতে পারে।

তবে এসব সমস্যার অর্থ এই নয় যে দুধ ও কলার সংমিশ্রণ নিজেই ক্ষতিকর।

দুধ ও কলা একসঙ্গে খেলে কি ওজন বেড়ে যায়?

দুধ ও কলা একসঙ্গে খেলেই ওজন বেড়ে যায়, এমন ধারণা ঠিক না। ওজন বাড়া বা কমার ক্ষেত্রে দিনের মোট ক্যালরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম এবং অন্যান্য বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

যারা স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন বাড়াতে চান, তাদের জন্য দুধ ও কলার মিশ্রণ বাড়তি ক্যালরি ও পুষ্টি পাওয়ার একটি উপায় হতে পারে। শরীরচর্চার পরও এটি প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটের উৎস হিসেবে কাজে আসতে পারে।

অন্যদিকে, যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তারা পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখতে পারেন। বিশেষ করে মিল্কশেকে অতিরিক্ত চিনি, মধু, আইসক্রিম বা মিষ্টি সিরাপ যোগ করলে ক্যালরির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে।

সহজ পরামর্শ: দুধ ও কলা খেতে চাইলে তাতে অতিরিক্ত চিনি না মিশিয়ে পরিমিত পরিমাণে খেতে পারেন।

দুধ ও কলা খাওয়ার মধ্যে কি সময়ের ব্যবধান রাখা প্রয়োজন?

অনেকের ধারণা, দুধ খাওয়ার অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর কলা খেতে হয়। কিন্তু সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে দুধ ও কলার মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান রাখা বাধ্যতামূলক, এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা নেই।

দুধ ও কলা একসঙ্গে খেয়ে যদি কোনো সমস্যা না হয়, তাহলে শুধু প্রচলিত ধারণার কারণে আলাদা করে খাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে একসঙ্গে খেলে অস্বস্তি হলে আলাদা সময়ে খেয়ে দেখতে পারেন।

আয়ুর্বেদে এই খাবারের সংমিশ্রণ নিয়ে কিছু সতর্কতা রয়েছে। কিন্তু ঐতিহ্যগত খাদ্যবিধি এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এক বিষয় নয়। তাই স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় প্রমাণভিত্তিক তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

কারা দুধ ও কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

অধিকাংশ সুস্থ মানুষ পরিমিত পরিমাণে দুধ ও কলা একসঙ্গে খেতে পারেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে: সাধারণ দুধের বদলে ল্যাকটোজমুক্ত দুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

দুধে অ্যালার্জি থাকলে: দুধ ও দুধজাত খাবার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এড়িয়ে চলতে হবে।

ডায়াবেটিস থাকলে: কলা ও দুধের পাশাপাশি মিল্কশেকে যোগ করা চিনি এবং মোট কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে: অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত উপাদান দিয়ে মিল্কশেক তৈরি না করাই ভালো।

বারবার পেটের সমস্যা হলে: খাবার খাওয়ার পর কী ধরনের উপসর্গ হচ্ছে, তা লক্ষ করুন। সমস্যা নিয়মিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দুধ ও কলা একসঙ্গে খাওয়া সাধারণত নিরাপদ এবং এই দুই খাবার থেকে শরীর বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পেতে পারে। এই সংমিশ্রণ খেলে শরীরে বিষ তৈরি হয়, হজমপ্রক্রিয়া নষ্ট হয় বা সবার ওজন বেড়ে যায়, এমন দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তবে খাবারের পরিমাণ, দুধ হজম করার ক্ষমতা এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে অস্বস্তি হতে পারে। তাই অকারণে দুধ ও কলা খাওয়া বন্ধ না করে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে খাবারের অভ্যাস ঠিক করাই ভালো।

সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিভি ৯ বাংলাতে ‘কলা ও দুধ একসঙ্গে খাওয়া কি ঠিক?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেল থেকে সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।