কলা আমাদের দেশের পরিচিত ও সহজলভ্য ফলগুলোর একটি। সকালের নাশতা, বিকেলের হালকা খাবার বা ব্যায়ামের পর অনেকেই কলা খেতে পছন্দ করেন। তবে কাঁচকলা ও পাকা কলার মধ্যে কোনটি বেশি উপকারী, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে ওজন কমানো, হজমের উন্নতি এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোন কলা বেছে নেওয়া ভালো, তা জানা জরুরি।
কাঁচকলা ও পাকা কলা দুটিতেই শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান আছে। তবে কলা পাকতে থাকলে এর ভেতরের শ্বেতসারের একটি বড় অংশ প্রাকৃতিক শর্করায় পরিণত হয়। এ কারণে দুই ধরনের কলার স্বাদ, গঠন ও হজমের প্রক্রিয়ায় পার্থক্য দেখা যায়। কাঁচকলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেশি থাকে, অন্যদিকে পাকা কলা নরম ও মিষ্টি হওয়ায় খেতে সহজ এবং দ্রুত শক্তি জোগাতে পারে। তাই কোন কলা বেশি উপকারী, তা নির্ভর করে ব্যক্তির প্রয়োজন ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
কাঁচকলা খাওয়ার উপকারিতা
কাঁচকলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে থাকা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ। এটি এমন এক ধরনের শ্বেতসার, যা ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম হয় না। এর কিছু অংশ বৃহদন্ত্রে পৌঁছে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে।
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে
কাঁচকলায় থাকা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার পুষ্টি জোগাতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শ্বেতসার ভেঙে কিছু উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া কাঁচকলার খাদ্যআঁশ হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে বেশি পরিমাণে খেলে কারও কারও গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে।
দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে পারে
কাঁচকলার রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ ও খাদ্যআঁশ হজমের গতি ধীর করতে পারে। ফলে খাওয়ার পর কিছু মানুষের দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভূত হতে পারে। যারা ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য এটি সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু কাঁচকলা খেলেই ওজন কমবে, তা না। সারাদিনে মোট কত ক্যালরি গ্রহণ করা হচ্ছে, শারীরিক পরিশ্রম কতটা হচ্ছে এবং অন্যান্য খাবারের ধরন কেমন, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব তুলনামূলক ধীর হতে পারে
কাঁচকলায় থাকা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ সহজে হজম হয় না। ফলে কিছু ক্ষেত্রে কার্বোহাইড্রেট শোষণের গতি কম হতে পারে এবং খাবারের পর রক্তে শর্করা তুলনামূলক ধীরে বাড়তে পারে।
তবে কাঁচকলা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সব পরিস্থিতিতে নিরাপদ, এমন ধারণা ঠিক না। পরিমাণ, রান্নার পদ্ধতি, অন্যান্য খাবার এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে। ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ঠিক করা উচিত।
পাকা কলা খাওয়ার উপকারিতা
কলা পাকতে থাকলে এর শ্বেতসারের একটি বড় অংশ সহজে হজমযোগ্য প্রাকৃতিক শর্করায় রূপান্তরিত হয়। এ কারণে পাকা কলা নরম ও মিষ্টি হয়। এতে পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ এবং খাদ্যআঁশের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানও থাকে।
দ্রুত শক্তি জোগাতে সাহায্য করে
পাকা কলায় থাকা কার্বোহাইড্রেট শরীরকে শক্তি জোগায়। তাই সকালে নাশতার সঙ্গে কিংবা ব্যায়ামের আগে বা পরে পাকা কলা খাওয়া যেতে পারে। তবে ব্যায়ামের পর শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও গ্রহণ করা জরুরি।
খেতে ও চিবাতে সহজ
পাকা কলা নরম হওয়ায় অনেকের জন্য খাওয়া সহজ। যাদের শক্ত খাবার চিবাতে অসুবিধা হয়, তারা পাকা কলা খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। তবে পাকা কলা সবার ক্ষেত্রে হজমের সমস্যা দূর করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে
পাকা কলায় পটাশিয়াম থাকে, যা পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজ এবং শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এতে ভিটামিন বি৬-ও রয়েছে, যা শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজে ভূমিকা রাখে।
পাকা কলায় প্রাকৃতিক শর্করা বেশি থাকলেও সেটি অস্বাস্থ্যকর খাবার, বিষয়টা এমন না। পরিমিত পরিমাণে পাকা কলা সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
ওজন কমাতে কোন কলা খাবেন?
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কাঁচকলা কিছুটা সুবিধা দিতে পারে। এতে থাকা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ ও খাদ্যআঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে ঘন ঘন খিদে পাওয়া বা অপ্রয়োজনে খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
তবে পাকা কলাকেও ওজন কমানোর খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এতে প্রাকৃতিক শর্করা থাকলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। মিষ্টি খাবারের বিকল্প হিসেবেও পাকা কলা খাওয়া যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ওজন কমা বা বাড়ার বিষয়টি শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিদিনের মোট ক্যালরি গ্রহণ, খাবারের পুষ্টিগুণ, শারীরিক সক্রিয়তা ও ঘুমের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস থাকলে কোন কলা খাবেন?
ডায়াবেটিস থাকলে কাঁচকলা খাওয়া যাবে কিন্তু পাকা কলা খাওয়া যাবে না, এমন নিয়ম নেই। কলার পরিপক্বতা, খাওয়ার পরিমাণ এবং ব্যক্তির রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা জরুরি।
সাধারণভাবে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়া যায়। তবে নিজের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা এবং চিকিৎসকের দেওয়া খাদ্যপরিকল্পনা অনুসরণ করা ভালো। কলার সঙ্গে টক দই বা অল্প বাদাম খেলে খাবারে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বিও যোগ হতে পারে।
প্রতিদিন কোন কলা খাওয়া ভালো?
কাঁচকলা ও পাকা কলা দুটিই পুষ্টিকর। অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ পেতে চাইলে কাঁচকলা ভালো বিকল্প হতে পারে। অন্যদিকে, সহজে খাওয়া যায় এমন ফল এবং দ্রুত শক্তির প্রয়োজন হলে পাকা কলা বেছে নেওয়া যেতে পারে।
কাঁচকলা সাধারণত রান্না করে খাওয়া হয়। অন্যদিকে, পাকা কলা সরাসরি খাওয়া যায়। তাই স্বাদ, রান্নার ধরন এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী দুটিই খাদ্যতালিকায় রাখা সম্ভব।
কাঁচকলা না পাকা কলা, কোনটি বেশি উপকারী, তার একক কোনো উত্তর নেই। কাঁচকলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেশি থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। পাকা কলা সহজে খাওয়া যায় এবং শরীরকে শক্তি জোগানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।
তাই নিজের প্রয়োজন, শারীরিক অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী কলা বেছে নেওয়াই ভালো। শুধু ওজন কমানো বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের আশায় কোনো একটি ধরনের কলাকে সবার জন্য সেরা ভাবার প্রয়োজন নেই। পরিমিত খাবার, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তাই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিভি ৯ বাংলাতে ‘কাঁচকলা না পাকা কলা, ওজন কমাতেই বা কে বেশি সাহায্য করে?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেল থেকে সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।