সারাদিন তো অফিসে বসে কাজ করতে কিংবা বাসায় থাকলে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই কেটে যায়। অনেকেই ভাবেন শরীরটাকে একটু চাঙা করতে সকালের রোদে হাঁটবেন। কিন্তু সকালে কোন সময়ে হাঁটতে গেলে শরীরের জন্য বেশি ভালো হবে কিংবা শরীর সঠিকভাবে পুষ্টি পাবে? এর পেছনে কি আলাদা কোনো নিয়ম রয়েছে?
সম্প্রতি হায়দ্রাবাদের বিশিষ্ট স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. সুধীর কুমার রোদে যাওয়ার সময় ও এর উপকারিতা নিয়ে কিছু তথ্য সামনে এনেছেন। কোন সময়ে রোদে গেলে ঠিক কী ধরনের উপকার পাওয়া যায় চলুন জেনে নেওয়া যাক-
ঘুম আর মেটাবলিজমের জন্য সকালের রোদ কেন জরুরি?
অনেকেই মনে করেন সকালে হাঁটতে বেরোলেই বোধহয় ভিটামিন ডি ঠিকঠাক পেয়ে গেলেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সকালের রোদের মূল কাজ শুধু ভিটামিন ডি সরবরাহ করা না, এর আরও কিছু কাজ রয়েছে।
সূর্য ওঠার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে—সাধারণত সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে যদি একটু খোলা বাতাসে বা রোদে দাঁড়ানো যায়, তবে তা আমাদের শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক রাখতে সাহায্য করে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বলা হয়।
প্রতিদিন নিয়ম করে ২০ থেকে ৩০ মিনিট সকালের এই মৃদু রোদ গায়ে মাখলে সারাদিন শরীর চাঙা থাকে, মনোযোগ বাড়ে এবং রাতের ঘুমও ভালো হয়। এ ছাড়া আমাদের মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়াকেও সচল রাখতে সাহায্য করে। তবে আবহাওয়া বা স্থানভেদে এর সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে।
তাহলে ভিটামিন ডি পাওয়ার ভালো সময় কোনটা?
এখন আপনি যদি শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি মেটাতে চান, তবে ভোরে বা খুব সকালে রোদে গিয়ে কাজ হবে না। কারণ ভিটামিন ডি তৈরি হওয়ার জন্য ত্বকে আল্ট্রাভায়োলেট বি বা ‘ইউভিবি’ রশ্মি দরকার, যা ভোরের দিকে অনেক কম থাকে।
ড. কুমারের মতে, ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য আদর্শ সময় হলো সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১:৩০টার মধ্যে। এই সময়ে সূর্য কিছুটা মাথার ওপরে থাকায় ইউভিবি রশ্মির পরিমাণ বেশি থাকে। সপ্তাহে অন্তত ৩ থেকে ৪ দিন, ১৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় হাতে রেখে রোদে দাঁড়াতে পারেন। শরীরের অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অংশে (যেমন হাত ও পায়ে) এই রোদ লাগাতে পারেন।
রোদ শরীরের জন্য ভালো মানে এই নয় যে দুপুরবেলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়তে হবে। ত্বকের ধরন, রোদ বা আবহাওয়ার তীব্রতা ভেদে এই সময়ের তারতম্য হতে পারে। বেশি সময় ধরে রোদে থাকলে আবার রোদে পোড়া ভাব বা স্কিন বার্ন হতে পারে। তাই সময় এবং রোদের তীব্রতা বুঝে রোদে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ভোরের রোদের কি তবে কোনো কার্যকারিতা নেই?
তা নয়! ভোরের রোদ হয়তো ভিটামিন ডি তৈরিতে খুব একটা কাজে লাগে না, কিন্তু এটি আমাদের মন ভালো রাখতে এবং বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক রাখতে বেশ কার্যকরী। তাই বলে শুধু সকালের রোদের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। যদি শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত। মনে রাখা উচিত, সূর্যের আলো কখনো পুষ্টিকর খাবার, সঠিক চিকিৎসা এবং ব্যায়ামের বিকল্প হতে পারে না।
রক্তচাপ ও মেটাবলিজম নিয়ে চিকিৎসকরা কী বলছেন?
চিকিৎসকদের মতে, সকালের আলোর সঙ্গে আমাদের মন ভালো থাকা এবং মেটাবলিজমের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া রোদের সংস্পর্শে গেলে ত্বকে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি হয়, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে রোদকেই কেবল উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বা ব্যায়ামের বিকল্প হিসেবে ধরে নেবেন না। সুস্থ থাকার জন্য সুষম খাবার ও নিয়মিত জীবনযাপনের পাশাপাশি সকালের রোদকে কেবল একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত।
বায়োলজিক্যাল ক্লোক ঠিক রাখতে ও ভালো ঘুমের জন্য বেছে নিন ভোরের রোদ, আর ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণে একটু দুপুরের দিকে রোদের সংস্পর্শে যান। আপনার নিজের শরীরের প্রয়োজন আপনাকেই বুঝতে হবে। শরীরের প্রয়োজন বুঝে সময়মতো একটু বাইরে পা রাখলেই দেখবেন শরীর ও মন দুটোই সতেজ থাকবে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া