রোদ থাকলেও শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হতে পারে। দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতরে কাটানো, শরীরের বড় অংশ ঢেকে রাখা, সানস্ক্রিন ব্যবহার, ত্বকের রং এবং খাদ্যাভ্যাস—এসব কারণে অনেকেরই ভিটামিন ডি পর্যাপ্ত হয় না। ফলে নিজে নিজে সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি সবার ভিটামিন ডি পরীক্ষা দরকার? আর পরীক্ষা ছাড়া সাপ্লিমেন্ট খাওয়া কতটা নিরাপদ?
ভিটামিন ডি শরীরের জন্য অপরিহার্য। এটি ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, হাড়ের গঠন ও শক্তি বজায় রাখে, পেশি ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় কাজে অংশ নেয়। দীর্ঘদিন ঘাটতি থাকলে শিশুদের রিকেটস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে ভিটামিন ডি-কে সব রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ভাবা ঠিক নয়। বিভিন্ন রোগের সঙ্গে ভিটামিন ডি-এর মাত্রার সম্পর্ক থাকলেও, বেশি খেলে সেই রোগ প্রতিরোধ হবে—এমন প্রমাণ সব ক্ষেত্রে নেই। ২০২৪ সালের এন্ডোক্রাইন সোসাইটির নির্দেশনাতেও সাপ্লিমেন্টের উপকার ও ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
রোদে থাকলেই কি ভিটামিন ডি পর্যাপ্ত হয়? না, সবসময় নয়। সূর্যের অতিবেগুনি বি (UVB) রশ্মি ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি করে, কিন্তু তা নির্ভর করে দিনের সময়, কতক্ষণ রোদে থাকছেন, শরীরের কতটুকু অংশ খোলা, সানস্ক্রিন ব্যবহার করছেন কি না, এবং ত্বকের ধরনের ওপর। গাল্ফ নিউজের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গরমের কারণে অনেকেই দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়ে ঘরের ভেতরে থাকেন, ফলে রোদ থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি মেলে না।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির লক্ষণ কী? অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে দুর্বলতা, ক্লান্তি, হাড় বা পেশিতে ব্যথা দেখা দিতে পারে। কিন্তু এসব লক্ষণ শুধু ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির কারণে নাও হতে পারে। ঘুমের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা মানসিক চাপ থেকেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। তাই শুধু ক্লান্ত লাগছে বলে নিজে নিজে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়।
পরীক্ষা ছাড়া সাপ্লিমেন্ট খাওয়া কি নিষেধ? বিষয়টি সূক্ষ্ম। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক সবার ভিটামিন ডি পরীক্ষা করাতে হবে—এমন সুপারিশ নেই। এন্ডোক্রাইন সোসাইটির ২০২৪ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত ২৫-হাইড্রক্সিভিটামিন ডি (25(OH)D) পরীক্ষা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৭৫ বছরের কম বয়সি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়নি। অর্থাৎ, সবার রক্ত পরীক্ষা দরকার নেই, আবার পরীক্ষা ছাড়া সবার উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট খাওয়াও ঠিক নয়। তবে কোনো ব্যক্তির ঘাটতির ঝুঁকি, অসুস্থতা বা চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী পরীক্ষা বা সাপ্লিমেন্টের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কোন পরীক্ষায় ভিটামিন ডি বোঝা যায়? সাধারণত রক্তে 25(OH)D পরীক্ষা করা হয়। এটি শরীরে ভিটামিন ডি-এর মজুতের মাত্রা বোঝার প্রধান পরীক্ষা। গাল্ফ নিউজের প্রতিবেদনেও এই পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রিপোর্ট হাতে পেলেই নিজে নিজে ওষুধের মাত্রা ঠিক করা উচিত নয়। কোন মাত্রায় চিকিৎসা প্রয়োজন এবং কতদিন প্রয়োজন, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা।
কারা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির ঝুঁকিতে থাকেন? সবার ঝুঁকি এক নয়। যারা দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতরে কাটান, খুব কম সময় রোদে থাকেন, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা বা স্তন্যদানকারী নারী, বুকের দুধ খাওয়া শিশু, স্থূলতা আছে এমন ব্যক্তি, ওজন কমানোর সার্জারি করা ব্যক্তি, ভিটামিন ডি শোষণে সমস্যা তৈরি করে এমন রোগে আক্রান্ত, এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনকারী—তাদের ঝুঁকি বেশি। গাল্ফ নিউজের প্রতিবেদনে অফিসকর্মী, শিফট কর্মী, কিশোর-কিশোরী, বয়স্ক, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী এবং স্থূলতা বা ব্যারিয়াট্রিক সার্জারির ইতিহাস থাকা ব্যক্তিদের সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়েছে।
বেশি ভিটামিন ডি খেলেই কি বেশি উপকার? না। ভিটামিন ডি এমন সাপ্লিমেন্ট নয় যে বেশি খেলে শরীর আরও ভালো থাকবে। এটি চর্বিতে দ্রবণীয়, তাই অতিরিক্ত পরিমাণ শরীরে জমতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, দুর্বলতা বা বিভ্রান্তির মতো সমস্যা হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনিতে পাথর বা কিডনির কার্যকারিতায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৫০ হাজার IU ক্যাপসুল কি নিজের ইচ্ছায় খাওয়া যায়? ফার্মেসিতে বিভিন্ন মাত্রার ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৫০ হাজার IU-এর মতো উচ্চমাত্রার ক্যাপসুলও রয়েছে। কিন্তু প্যাকেটে পাওয়া যাচ্ছে বলেই এটি নিয়মিত খাওয়ার জন্য নিরাপদ, এমন নয়। উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি সাধারণত নির্দিষ্ট ঘাটতি পূরণের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঘাটতি পূরণ হয়ে গেলে একই উচ্চমাত্রা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সপ্তাহে বা মাসে উচ্চমাত্রার ক্যাপসুল খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত নয়।
প্রতিদিন কতটা ভিটামিন ডি প্রয়োজন? সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বয়স অনুযায়ী দৈনিক প্রয়োজন আলাদা। এন্ডোক্রাইন সোসাইটির নির্দেশনায় ইনস্টিটিউট অব মেডিসিনের রেকমেন্ডেড ডায়েটারি অ্যালাউয়েন্স অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। ১৯ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের জন্য দৈনিক ৬০০ IU বা ১৫ মাইক্রোগ্রাম, এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৮০০ IU বা ২০ মাইক্রোগ্রাম। তবে এটি সাধারণ দৈনিক পুষ্টি চাহিদা, কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার ডোজ নয়। ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসক সাময়িকভাবে ভিন্ন মাত্রা দিতে পারেন।
৪ হাজার IU কি নিরাপদ সীমা? NIH অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টসের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণভাবে দিনে ৪ হাজার IU-এর বেশি ভিটামিন ডি না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি সর্বোচ্চ সীমা (Upper Limit) হিসেবে বিবেচিত। তবে এর অর্থ এই নয় যে সবার প্রতিদিন ৪ হাজার IU খাওয়া উচিত। বরং এটি এমন একটি সীমা, যার বেশি গ্রহণ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া করা উচিত নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এর চেয়ে বেশি মাত্রা দিতে পারেন।
কারা নিজের মতো করে ভিটামিন ডি খাবেন না? কিছু স্বাস্থ্যগত অবস্থায় নিজে নিজে সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়। বিশেষ করে যাদের কিডনির রোগ, প্যারাথাইরয়েডের সমস্যা বা সারকয়ডোসিস রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত নয়। কিছু ডাইইউরেটিক ও হৃদরোগের ওষুধের সঙ্গে ভিটামিন ডি-এর সম্পর্ক থাকতে পারে। নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে নতুন সাপ্লিমেন্ট শুরুর আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জানানো ভালো।
অনেক বছর ধরে ভিটামিন ডি খেলে কী করবেন? অনেকে বছরের পর বছর সাপ্লিমেন্ট খান। কারও হয়তো শুরুতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল, কিন্তু পরে আর মাত্রা বা প্রয়োজন যাচাই করা হয়নি। এমন হলে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই, তবে সাপ্লিমেন্টটি এখনও প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো। বিশেষ করে উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট দীর্ঘদিন খেলে নিজের মতো করে চালিয়ে না গিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করানো উচিত। গাল্ফ নিউজের প্রতিবেদনেও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুনর্মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
খাবার থেকে কি ভিটামিন ডি পাওয়া যায়? খাবার থেকেও কিছু পরিমাণ ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ডি দিয়ে সমৃদ্ধ করা খাবার এর উৎস। তবে শুধু খাবার থেকে সবার প্রয়োজনীয় পরিমাণ পাওয়া সম্ভব নয়। খাদ্যাভ্যাস ও শরীরের প্রয়োজনের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। সুষম খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সাপ্লিমেন্ট খেলে খাবারের সঙ্গে খাওয়া ভালো? ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবণীয়, তাই খাবারের সঙ্গে, বিশেষ করে কিছুটা চর্বিযুক্ত খাবারের সঙ্গে নিলে শোষণ ভালো হয়। গাল্ফ নিউজের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেছেন। তবে সাপ্লিমেন্টের ধরন ও ব্যক্তির অবস্থার ওপর নির্দেশনা ভিন্ন হতে পারে। তাই প্যাকেটের নির্দেশনা বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।
শুধু রোদে থাকলেই কি সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন নেই? এটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। রোদে থাকা ভিটামিন ডি তৈরির প্রাকৃতিক উপায়, কিন্তু কতটা তৈরি হচ্ছে তা ব্যক্তিভেদে আলাদা। তাই রোদে থাকেন না মানেই ঘাটতি আছে, আবার নিয়মিত রোদে থাকেন মানেই পর্যাপ্ত—দুটি ধারণাই ঠিক নয়। ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মূল্যায়ন করা ভালো।
তাহলে কী করবেন? ভিটামিন ডি নিয়ে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো প্রয়োজন ও মাত্রার ভারসাম্য রাখা। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট শুরু করবেন না। ঝুঁকিতে থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা দরকার কি না ঠিক করুন। উচ্চমাত্রার ক্যাপসুল খেলে কতদিন খেতে হবে তা জেনে নিন। দীর্ঘদিন খেলে প্রয়োজন ও মাত্রা পুনর্মূল্যায়ন করুন। অন্য ওষুধ খেলে সাপ্লিমেন্ট শুরুর আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জানান। শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর প্রয়োজন আলাদা, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন ডি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় মানেই যত বেশি তত ভালো—এমন নয়। ঘাটতি থাকলে সাপ্লিমেন্ট উপকারী, আবার অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি মাত্রায় দীর্ঘদিন খেলে ক্যালসিয়াম বেড়ে গিয়ে ক্ষতি হতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক সবার নিয়মিত ভিটামিন ডি পরীক্ষা করানো দরকার নেই। ২০২৪ সালের এন্ডোক্রাইন সোসাইটির নির্দেশনা সাধারণ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়মিত 25(OH)D স্ক্রিনিংয়ের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছে। তাই শুধু অনুমানের ভিত্তিতে উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে নিজের বয়স, খাদ্যাভ্যাস, রোদে থাকার অভ্যাস, ঝুঁকির কারণ এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা ও সঠিক মাত্রা নির্ধারণই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সূত্র: গাল্ফ নিউজ