সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের লক্ষ্যে সুনামগঞ্জ জেলার ৪৪৫টি পূজামণ্ডপে চলছে দেবী বরণের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ঢাক, ঢোল, শঙ্খ ও উলুধ্বনির মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ভক্তরা। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় পূজামণ্ডপের সংখ্যা ২৭টি বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিভিন্ন পূজা পরিচালনা ও উদযাপন কমিটির দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা তৈরি, প্যান্ডেল নির্মাণ এবং আলোকসজ্জার চূড়ান্ত কাজ চলছে। প্রতিমা তৈরির কারিগররা এই সময়ে অত্যন্ত ব্যস্ত রয়েছেন। রং-তুলির নিখুঁত ছোঁয়ায় প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুরো উৎসবটি যেন নির্বিঘ্ন, আনন্দময় ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্য পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকেও সার্বিক তদারকি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলায় গত বছরের চেয়ে এবার ২৭টি পূজামণ্ডপ বেশি। এবার মোট ৪৪৫টি পূজামণ্ডপের মধ্যে ৪৩৬টি সার্বজনীন এবং ৯টি ব্যক্তিগত মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে শুরু হবে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এরপর ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এই দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। উৎসবকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে জেলার প্রতিটি মণ্ডপে সৌন্দর্যবর্ধন ও প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে।

সুনামগঞ্জ শহরের সোমপাড়ার প্রতিমা তৈরির কারিগর প্রফুল্ল চন্দ্র পাল বলেন, “গত ২০ বছর ধরে আমরা দুর্গাদেবীসহ অন্যান্য পূজার সময় প্রতিমা তৈরি করে থাকি। গত বছর দুর্গাদেবীর আটটি প্রতিমা তৈরি করেছিলাম, এবারও আটটি প্রতিমা তৈরি করেছি। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে, এখন রঙের কাজ চলছে। দুই দিনের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।”

সুনামগঞ্জ শহরের সবচেয়ে বড় পূজামণ্ডপ হিসেবে পরিচিত পূর্ব নতুনপাড়া সার্বজনীন পূজামণ্ডপ। এই পূজা পরিচালনা কমিটির সভাপতি স্বপন সরকার বলেন, “প্রায় ৪০ বছর ধরে আমরা পূজা করছি। আমাদের পূজার সঙ্গে পাড়ার প্রায় ৮০০ পরিবার জড়িত। আমাদের প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ। এখন আলোকসজ্জার পাশাপাশি অন্যান্য কাজ চলছে।”

তিনি আরও বলেন, “দুর্গাদেবীকে বরণ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করছি আমরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আমরা নিজেদের স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রেখেছি। পূজামণ্ডপে পুরুষ ও নারীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য পৃথক পথ থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন।”

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট গৌরাঙ্গ পদ দাস ও সাধারণ সম্পাদক বিপ্রেশ রায় বাপ্পী বলেন, “শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা সম্পন্ন করতে সব পূজামণ্ডপের দায়িত্বশীলদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলা পরিদর্শন করেছি। প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখা ও স্বেচ্ছাসেবক দল রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সুন্দর পরিবেশে পূজা সম্পন্ন করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে। আমাদের আশা, শারদীয় উৎসব সুন্দর পরিবেশেই সম্পন্ন হবে।”

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ.বি.এম. জাকির হোসেন বলেন, “গত বছরের ন্যায় সুনামগঞ্জে এবারও সুন্দর পরিবেশে শারদীয় উৎসব সম্পন্ন করতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থার লোকজন নিয়মিত কাজ করছেন। পূজামণ্ডপগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপগুলোতে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাদাপোশাকে মাঠে থাকবেন।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখার জন্য বলা হয়েছে। পারস্পরিক সহমর্মিতা বজায় রাখতে পূজামণ্ডপের আশপাশে মসজিদ থাকলে আজান ও নামাজের সময় বাদ্যযন্ত্র না বাজানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।”

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সুনামগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ১৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত তারা নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবেন। সুন্দর পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে জেলা প্রশাসন সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।