শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে চাঁদপুরে এখন চরম ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত জেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপেই এখন কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে। কোথাও প্রতিমার গায়ে রঙের শেষ আঁচড় দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও মণ্ডপ সাজাতে ব্যস্ত আয়োজকেরা। কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। এর পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোতে সাজসজ্জা এবং নিরাপত্তার বিশেষ প্রস্তুতি চলছে।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার চাঁদপুর জেলার আটটি উপজেলায় মোট ২৩২টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলায় ৪১টি, ফরিদগঞ্জে ২৩টি, হাইমচরে ৬টি, হাজীগঞ্জে ২৯টি, মতলব দক্ষিণে ৩৯টি, মতলব উত্তরে ৩৬টি, কচুয়ায় ৩৯টি এবং শাহরাস্তিতে ১৯টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চাঁদপুরের শহরের কালীবাড়ি মন্দির প্রাঙ্গণে প্যান্ডেল স্থাপন, প্রতিমা নির্মাণ, আলপনা অঙ্কন ও সাজসজ্জার কাজ পুরোদমে চলছে। সেখানে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে দেবী দুর্গা, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও লক্ষ্মীর প্রতিমা। প্রতিমার সঠিক আকৃতি দিতে কঠোর পরিশ্রম করছেন কারিগরেরা। দিনরাত চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। শিল্পী ও তাদের সহযোগীরা মিলে খড় ও মাটির সাহায্যে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করছেন এবং এরপর তাতে রং দেওয়া হচ্ছে।

এবার মন্দির প্রাঙ্গণগুলো ভিন্ন ভিন্ন থিমে সাজানো হচ্ছে। ইতিবাচক ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে দেশের গুণীজনদের ছবি এবং বিভিন্ন উপদেশমূলক বাণীও টাঙানো হয়েছে মণ্ডপগুলোতে।

প্রতিমা নির্মাণশিল্পী জগবন্ধু পাল বলেন, “প্রতি বছরের মতো এবারও তারা দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এরই মধ্যে কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে। বাইরের কাজ শেষ হলেও কারখানার কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এ বছর তারা ১২টি প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন। বর্তমানে ছয়জন মিলে কাজ করছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। পাট ও মাটির দামও বেড়েছে। কাজের শুরুতে ব্যস্ততা ও চাপ থাকলেও প্রতিমা তৈরি শেষে মণ্ডপে স্থাপন করা হলে অন্য রকম আনন্দ তৈরি হয়। এবার প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।”

কালীবাড়ি মন্দিরের পূজা আয়োজক প্রভাষ সাহা জানান, গত দুই মাস ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। পূজার পাঁচ দিন দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা থাকবে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিদেশ থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন বলে জানান তিনি। এবার প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষের সমাগম প্রত্যাশা করছেন আয়োজকেরা।

চাঁদপুর জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক বিনয় ভূষণ মজুমদার ও সদস্যসচিব অজিত সাহা জানান, এ বছর চাঁদপুর জেলার আট উপজেলায় মোট ২৩২টি মণ্ডপে সাড়ম্বরে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনের লক্ষ্যে সার্বিক নিরাপত্তাসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। উৎসবকে ঘিরে মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় দেবী প্রতিমা গড়ার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে আলোকসজ্জা ও মণ্ডপসজ্জার প্রস্তুতিও পুরোদমে চলছে।

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলসহ সবার সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পূজা উদ্‌যাপন সুন্দরভাবে করা যাবে। আনসার সদস্যদের সরকার যে সম্মানী দিয়েছে, এর মধ্যেই কাজ করতে হবে। সিসি ক্যামেরা লাগাতে হবে। মণ্ডপগুলোতে সাধ্যের মধ্যে সিসি ক্যামেরা বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পূজা উপলক্ষে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবেন।”

জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, “সবাই মিলে উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করতে হবে। সব পূজামণ্ডপকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। পূজামণ্ডপগুলোকে কঠোর নজরদারিতে রাখা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে কোনো অপতথ্য প্রচার না হয়। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে পূজার সময় সহযোগিতা করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সবাই পূজা উদ্‌যাপন পরিষদকে সহযোগিতা করবেন।”

তিনি আরও বলেন, “চাঁদপুর পৌরসভাসহ সব পৌরসভাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো পূজামণ্ডপে সমস্যা থাকলে তা জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচার হলে সংশ্লিষ্টদের জানাতে হবে অথবা জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকক্ষে অবহিত করতে হবে। পূজার সময় স্বাস্থ্য বিভাগ আলাদা মেডিকেল টিম রাখবে। পূজামণ্ডপের আশপাশে দোকান বা বাজার থাকতে পারে, তবে কোনোভাবেই মেলা বসানো যাবে না। কিশোর গ্যাংয়ের প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয়।”

চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বলেন, “পূজায় তাদের দলের নেতাকর্মীরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মণ্ডপ কমিটিসহ সবার সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করবেন। তারা চান, নির্বিঘ্নে পূজার উৎসব পালনে কোনো বিঘ্ন না ঘটুক। এটি তাদের দলীয় প্রধান তারেক রহমানেরও নির্দেশনা বলে জানান তিনি।”