প্রতিমা স্থাপন এবং মণ্ডপ সাজানোর যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ। শুক্রবার থেকেই শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। মণ্ডপগুলোতে এখন মন্ত্রপাঠ, উলুধ্বনি এবং ঢাক, শঙ্খ ও কাঁসরের বাদ্যের গুঞ্জন। পুরোহিতরা ব্যস্ত আরাধনায়। পূজার আগে মণ্ডপগুলোতে যে প্রস্তুতি চলছিল, পূজা শুরু হতেই তার রূপ বদলেছে এক উৎসবমুখর পরিবেশে।

পূজার সময় মন্দির ও মণ্ডপ সাজানোর বিষয়ে ভক্তদের বিশেষ আগ্রহ থাকে। প্রতি বছরই নতুন নতুন থিম এবং আকর্ষণীয় সাজসজ্জার মাধ্যমে মণ্ডপ সাজানো নিয়ে চলে এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা। শনিবার সকালে মৌলভীবাজার শহরের বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শনে সেই সৃজনশীল প্রচেষ্টার ছাপ স্পষ্ট দেখা গেছে। কোনো মণ্ডপ সাজানো হয়েছে ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দিরের আদলে, আবার কোনোটি সেজেছে কৈলাস মন্দিরের রূপে। আবার কোনো মণ্ডপের ভাবনা অত্যন্ত সহজ ও সরল, যার থিম হলো— ‘মা আসলেই আনন্দ।’

কেবল মণ্ডপগুলোই নয়, চারপাশের পরিবেশও রঙিন হয়ে উঠেছে নানা ধরনের ফেস্টুন ও ব্যানারে। কিছু মণ্ডপ এলাকায় রীতিমতো মেলার আমেজ তৈরি হয়েছে। পসরা সাজিয়ে বসেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। শিশুদের বিনোদনের জন্য দোলনা এবং নানা আয়োজন করা হয়েছে কিছু মণ্ডপ প্রাঙ্গণে। সব মিলিয়ে সর্বত্রই উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

মৌলভীবাজার শহরের কাশীনাথ আলাউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠের মহেশ্বরী মণ্ডপটি সাজানো হয়েছে দিনাজপুরের প্রাচীন কান্তজিউ মন্দিরের আদলে। মন্দিরের শিলালিপি অনুযায়ী, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তাঁর শেষ বয়সে এই মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণকাজটি সম্পন্ন করেন। কান্তজিউ মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হলো এর অসাধারণ টেরাকোটা শিল্প। পৌরাণিক কাহিনীগুলো পোড়ামাটির অলংকরণে দেয়ালের গায়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মহেশ্বরী মণ্ডপে সেই দৃষ্টিনন্দন টেরাকোটার কাজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। শনিবার সকালে দেখা গেছে, মণ্ডপের ভেতরে চূড়ান্ত পর্যায়ের কিছু কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। মণ্ডপের সামনের অংশটি অত্যন্ত সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি এলাকাটি বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুনে রঙিন হয়ে উঠেছে, যার মধ্যে স্থানীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের শুভেচ্ছাবার্তাও রয়েছে।

মহেশ্বরী পূজামণ্ডপের পুরোহিত সৌরিন ভট্টাচার্য বলেন, “প্রতিবারের মতো এবারও মণ্ডপটি বর্ণিলভাবে সাজানো হয়েছে। ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দিরের আদলে শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন করে মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে।”

অন্যদিকে, শহরের সৈয়ারপুর এলাকার ত্রিনয়নী শিববাড়ি মন্দিরটি সেজেছে ভারতের মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ জেলার ইলোরা গুহার বিখ্যাত কৈলাস মন্দিরের রূপে। কালচে পাথুরে রঙের এই মণ্ডপটি কৈলাস মন্দিরের আদলেই তৈরি, যা শিলাখণ্ডের মুখ থেকে খোদাই করে নির্মিত বৃহত্তম মন্দিরের একটি প্রতিচ্ছবি। ত্রিনয়নী মণ্ডপের ভেতর ও বাহির সবখানেই কৈলাসের আবহ রাখা হয়েছে। শনিবার সকালেও সেখানে কিছু পরিমার্জন কাজ চলতে দেখা গেছে।

ত্রিনয়নী মণ্ডপ এলাকায় রীতিমতো মেলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ফরেস্ট অফিস রোডের দুধারে স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি অস্থায়ী দোকান বসেছে। এসব দোকানে বিভিন্ন পণ্য সাজানো রয়েছে। মণ্ডপের পাশে ফুচকা, আইসক্রিম এবং শিশুদের খেলনা ও প্রসাধনীর দোকান বসেছে। শিশুদের বিনোদনের জন্য দোলনা, চরকি, নৌকা এবং খেলনা রেলগাড়ি আনা হয়েছে।

ত্রিনয়নী শিববাড়ি পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি স্বাগত কিশোর দাশ চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রতিবছরই আমাদের আয়োজনে নতুন একটা কিছু থাকে। এবারে আমাদের থিম হচ্ছে কৈলাস থেকে দেবীর মর্ত্যলোকে বা মানুষের মধ্যে আগমনের বিষয়টি। মণ্ডপটিকে কৈলাস মন্দিরের আদলে সাজানো হয়েছে।”

শহরের আবাহন পূজামণ্ডপের এবারের থিম রাখা হয়েছে ‘দৈবদ্বার’। মণ্ডপের সভাপতি সন্তোষ কান্তি দাশ জানান, থিমের সাথে মিল রেখে এখানে ২৫ জন দেব-দেবীর প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে। মণ্ডপটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং ভেতরে বিভিন্ন বাণী ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

সৈয়ারপুর লক্ষ্মীবালা স্কুল রোডের নবরূপা সংঘ তাদের মণ্ডপে দেবী দুর্গার ঘোড়ায় আগমন এবং নৌকায় গমনের বার্তাটি প্রতীকী ও সহজ চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে। মনু সেতুর কাছে হরিজন যুবসংঘের মণ্ডপটিও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, যাদের সরল থিম হলো— ‘মা আসলেই আনন্দ’। এছাড়া শহরের সাইফুর রহমান সড়কে শামিয়ানা টাঙিয়ে উৎসবের আমেজ তৈরি করা হয়েছে।

মৌলভীবাজার পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এবার পুরো জেলায় ব্যক্তিগত ১২২টিসহ মোট ১ হাজার ২২টি পূজামণ্ডপ স্থাপন করা হয়েছে।

মৌলভীবাজার পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মহিম দে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সুন্দরভাবে পূজা শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও খুব তৎপর আছে। এখনো কোনো সমস্যা নেই।”

সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন পূজা উদ্‌যাপন ফ্রন্টের আহ্বায়কায়ক সুনীল কুমার দাশ। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন সুন্দরভাবে কাজ করছে। আশা করছি, সুন্দরভাবেই পূজা সম্পন্ন হবে।”

জেলা পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অনেক দিন ধরেই আমাদের প্রস্তুতি চলছে। পূজা সুন্দরভাবে উদ্‌যাপন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া আছে। সীমান্ত এলাকাতে বিজিবি আছে। প্রয়োজনে পুলিশও সহযোগিতা করবে।”