পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)—উভয় পক্ষই মাওলানা ফজলুর রহমানের শরণাপন্ন হচ্ছে। দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারেন বলে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এই প্রবীণ রাজনীতিকের নাম।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে মাওলানা ফজলুর রহমানের হাতে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ক্ষমতা অবশিষ্ট আছে? এক সময়ের তুলনায় তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করা হয়। তাঁর দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-পাকিস্তানের (জেইউআই-এফ) জাতীয় পরিষদে বর্তমানে মাত্র ১০টি আসন রয়েছে। এছাড়া খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রাদেশিক পরিষদে দলটির আসন সংখ্যা ১৮টি এবং বেলুচিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ১২টি। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পিটিআই সরকারের বিপরীতে বিরোধী দলে রয়েছে জেইউআই-এফ এবং বেলুচিস্তানেও দলটি বিরোধী শিবিরে অবস্থান করছে। তবে উচ্চকক্ষ সিনেটে দলটির সাত সদস্য এখনো নিজেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ধরে রেখেছেন।

আসন সংখ্যার এই হিসাবের ওপর ভিত্তি করে কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, যেহেতু দুই প্রাদেশিক সরকারের কোনোটিতেই মাওলানা ফজলুর রহমানের সরাসরি কোনো ভূমিকা বা উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব নেই, তাই সরকার কিংবা পিটিআইয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মতো শক্তিশালী অবস্থানে তিনি নেই। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ আগেই মন্তব্য করেছেন যে, জেইউআই-এফ প্রধানের পক্ষে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমিয়ে আনার সম্ভাবনা খুব একটা নেই।

অন্যদিকে, অনেকের ধারণা দুই পক্ষই এখন কেবল লোকদেখানো বা মুখরক্ষার পথ খুঁজছে। পিটিআই আসলে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ইসলামাবাদে যেতে আগ্রহী নয়, আবার সরকারও রাজধানীর ভেতরে আরেকটি রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে চায়। রানা সানাউল্লাহ এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কিন্তু সরকার ও পিটিআই—দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসানোর বিষয়ে তিনি কোনো আশ্বাস দেননি।”

পার্লামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী সম্প্রতি দাবি করেছেন, মাওলানার মধ্যস্থতার বিষয়ে পিটিআই নেতাদের মধ্যে মতভেদ বা বিভক্তি রয়েছে। ফলে জেইউআই-এফ প্রধানের দেওয়া যেকোনো প্রস্তাব দলটি গ্রহণ নাও করতে পারে। তবে খাইবার পাখতুনখাওয়ার পিটিআই সভাপতি জুনায়েদ আকবর গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, তাঁর দল মাওলানা ফজলুর রহমানকে ‘মধ্যস্থতা’র দায়িত্ব দিয়েছে। যদিও তিনি এ কথা উল্লেখ করেছেন যে, মাওলানা এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাবের কথা তাঁদের জানাননি।

এক সময়ের সেই ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব হয়তো এখন আর নেই, তবে মাওলানা ফজলুর রহমানকে এখনো রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে রাখা সম্ভব নয়। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেজিসলেটিভ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সির (পিলড্যাট) সভাপতি আহমেদ বিলাল মাহবুব মনে করেন, দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারলে তা মাওলানা ফজলুর রহমানই পারবেন, কারণ তিনি বিরল ধরনের একজন রাজনীতিক। তিনি আরও বলেন, বর্তমান নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই পক্ষই মুখরক্ষা করতে চায়, তাই তারা অবশ্যই পুনরায় আলোচনা শুরুর চেষ্টা করবে।

বাস্তব পরিস্থিতি এমন যে, পিটিআই নেতারা কারাবন্দী ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি জানিয়েছেন, আর সরকার পিটিআইকে তাদের লংমার্চ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে দলটির এই কর্মসূচি এখনো চলমান। এই প্রেক্ষাপটে আহমেদ বিলাল মাহবুব বলেন, “আমার মনে হয়, এই পরিস্থিতিতে মাওলানা সমঝোতার একটি পথ বের করতে পারবেন।”

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পিটিআই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) জোটের নেতা ছিলেন মাওলানা ফজলুর রহমান। এর আগে ২০১৯ সালে খাকি পোশাক পরা বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীকে নিয়ে তিনি রাজধানী ইসলামাবাদে সমাবেশ করেছিলেন এবং ইমরান খানের পদত্যাগের দাবিতে প্রায় দুই সপ্তাহ সেখানে অবস্থান করেন।

বর্তমানে তাঁর ভূমিকা ঠিক কী, তা নিয়ে জেইউআই-এফের মুখপাত্র আসলাম ঘুরি জানিয়েছেন, তাঁর দলের প্রধান কোনো আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী নন। বরং তিনি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি করার চেষ্টা করছেন। আসলাম ঘুরি বলেন, মধ্যস্থতাকারী হলে দুই পক্ষের দাবি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকত মাওলানার; কিন্তু এখন তাঁর কাজ হলো দুই পক্ষকে আলোচনায় বসতে সাহায্য করা।

আসলাম ঘুরি আরও জানান, তাঁরা সরকারকে পার্লামেন্টে একটি সর্বদলীয় সম্মেলন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। জেইউআই-এফ নেতার মতে, আলোচনায় বসলে দুই পক্ষই লাভবান হবে এবং সবচেয়ে বেশি লাভ হবে পিটিআইয়ের। কারণ, খাইবার পাখতুনখাওয়ার সরকার কার্যত অন্য কেউ চালাচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি নন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অ্যাবোটাবাদে কার নির্দেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হলো? পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনারই বা কার নির্দেশে পিটিআইয়ের লংমার্চ আটকে দিতে সড়কে কনটেইনার রেখেছেন?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত রোববার কেন্দ্রীয় সরকার সেখানে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এর ফলে কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআই পরিচালিত ওই প্রাদেশিক সরকারের সব কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে গেল এবং প্রদেশটিতে গভর্নরের শাসন জারি হলো।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ খুব শীঘ্রই মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তবে আসলাম ঘুরি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে তাঁরা এখনো কোনো ইঙ্গিত পাননি। এদিকে পিটিআই নেতা শওকত ইউসুফজাই এক টক শোতে দাবি করেছেন, মাওলানা ইতিমধ্যে এই বিষয়ে ভূমিকা রেখেছেন এবং তাঁর পরামর্শেই পিটিআই লংমার্চের তারিখ ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করা হয়েছিল। তবে পিটিআই নেতা আসাদ কায়সার পরবর্তীতে এই দাবি অস্বীকার করেন।

রাজনৈতিক প্রভাবের হ্রাস ঘটলেও মাওলানা ফজলুর রহমানকে এখনো উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ২৬তম সংবিধান সংশোধনী পাসের উদ্যোগ নেওয়ার সময়ও সরকারকে তাঁর সমর্থন চাইতে হয়েছিল। তখন জেইউআই-এফের আটজন সদস্যের ভোটের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও পিটিআই-সমর্থিত ছয় সদস্যের ভোট সংশোধনীটি পাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিনেটেও তাঁর দলের পাঁচ সদস্যের সমর্থন সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী পাসের ঘটনা পার্লামেন্টে তাঁর প্রভাব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

২০২৫ সালে সংরক্ষিত আসন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নির্বাচন কমিশন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন), পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও জেইউআই-এফকে আসন ফিরিয়ে দেয়। এতে জাতীয় পরিষদে ক্ষমতাসীন জোটের আসনসংখ্যা ২৩০ ছাড়িয়ে যায় এবং জোটটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মাওলানা ফজলুর রহমান জানান, তাঁর দল ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর পক্ষে ভোট দেবে না। তখনই খবর প্রকাশিত হয় যে, জেইউআই-এফের সাত সদস্যের সমর্থন ছাড়াই ৯৬ সদস্যের সিনেটে সরকারের পক্ষে ৬৫ জনের সমর্থন রয়েছে।