খাইবার পাখতুনখাওয়ায় (কেপি) গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্তকে আইনি চ্যালেঞ্জ জানাতে আদালতের দ্বারস্থ হবে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। দলের সাধারণ সম্পাদক সালমান আকবর রাজা এই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই বিষয়ে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।

পাকিস্তানের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল জিও নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালমান আকবর বলেন, ‘এটা আমাদের অধিকার। আমাদের যুক্তি ও প্রমাণ ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।’

পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি সহ আরও বেশ কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে পিটিআই এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যেই গত রবিবার খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকার সংবিধানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দুটি অনুচ্ছেদের আওতায় এই জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে ওই প্রদেশে পিটিআই পরিচালিত প্রাদেশিক সরকারের যাবতীয় কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে পড়েছে।

সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে চলমান এই সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-পাকিস্তানের (জেইউআই-এফ) নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান। সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে উভয় পক্ষই তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে পিটিআই সাধারণ সম্পাদক সালমান আকবর বলেন, ‘মাওলানা ফজলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী সব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও বলেছিলেন, বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এগিয়ে নেবেন। কিন্তু এরপর সরকার আলোচ্যসূচি বদলে ফেলে।’

অন্যদিকে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই বলে দাবি করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাস মোকাবিলায় সব রাজনৈতিক দলকে একযোগে কাজ করতে হবে। তালাল চৌধুরী উল্লেখ করেন, ‘দ্য ফার্স্ট ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান’ বা প্রথম জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অধীনে সব রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ফলে একসময় দেশে শান্তি ফিরে এসেছিল।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার কয়েকটি জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতির কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে মানুষ এখন বিয়ের অনুষ্ঠান বা জানাজা পর্যন্ত আয়োজন করতে পারছে না। ওই প্রদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বরাদ্দ করা অর্থের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ১৩ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকার ফরেনসিক ল্যাবরেটরি ও সেফ সিটি প্রকল্প চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে।

একই সঙ্গে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফ পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার মধ্যে তুলনা করে পিটিআই নেতৃত্বাধীন খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৩ বছর ধরে সেখানে অস্থিরতা, অপশাসন এবং উন্নয়নের চরম ঘাটতি বিদ্যমান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মরিয়ম পাঞ্জাবের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গণপরিবহন, পয়োনিষ্কাশন ও অবকাঠামো খাতের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। একই ধরনের অগ্রগতি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় কেন সম্ভব হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। মরিয়ম আরও বলেন, পার্থক্য সম্পদের নয়; বরং সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে চলা কথিত অপশাসনের কারণেই প্রদেশটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার চেয়ে জনসেবা ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মরিয়ম বলেন, ‘কথার ফুলঝুরি দিয়ে নয়, সরকার পরিচালিত হয় কাজ, কাজ আর কাজ দিয়ে।’

এদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন জারির পর গত সোমবার সড়ক অবরোধের কারণে প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল। তবে আজ মঙ্গলবার পেশোয়ারের সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে বলে জানিয়েছেন শহরের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি)। এ বিষয়ে কোনো ‘ভুয়া বিজ্ঞপ্তি বা গুজবে’ কান না দেওয়ার জন্য জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে।

ডনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জেলা প্রশাসন একই সঙ্গে পেশোয়ারে সাত দিনের জন্য সব ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, খাইবার পাখতুনখাওয়ার ডেরা ইসমাইল খান জেলার সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় আজও বন্ধ থাকবে এবং ওই দিনের নির্ধারিত সব পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।