পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে আজ শনিবার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদ এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ইসলামাবাদমুখী লংমার্চের কারণে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে প্রদেশটিতে কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন জারির হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমন এক সংকটজনক মুহূর্তে দুই শীর্ষ নেতার এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ভবন আইওয়ান-ই-সদরে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দুই নেতা ‘দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন।’
উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে সরকার ও পাকিস্তান পিপিপির (পিপিপি) বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি, অ্যাটর্নি জেনারেল মনসুর উসমান আওয়ান, আইন ও বিচারমন্ত্রী আজম নাজির তারার এবং সিনেটর শেরি রেহমান।
বৈঠক শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বৈঠকে মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের আলাদা অধিবেশন ডাকার বিষয়ে একমত হওয়া গেছে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট জারদারির সঙ্গে বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ টেলিফোনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজলের (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেন্দ্রীয় সরকার ও খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনের উপায়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওমরাহ পালন শেষ করে ফেরার জন্য শাহবাজ শরিফ মাওলানা ফজলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এসে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানান। জেইউআই-এফ প্রধান এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন এবং খুব শীঘ্রই তাঁদের মধ্যে সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘কেন্দ্রীয় সরকার ও খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন ফজলুর রহমান।’
জেইউআই–এফের মিডিয়া সেলের মাধ্যমে দলটির মুখপাত্র আসলাম গৌরির একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তিনি জানান, দুই নেতা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কেন্দ্র ও খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের মধ্যে চলমান উত্তেজনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গৌরির দাবি, মাওলানা ফজলুর রহমান পিটিআই নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি পিটিআই নেতৃত্বকে আস্থায় নিয়েছেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত রেডিও পাকিস্তানের খবর অনুযায়ী, এর আগে আজ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তানবিষয়ক মন্ত্রী আমির মুকাম এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি পেশোয়ারের গভর্নর হাউসে এক বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চলমান লংমার্চ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা হয়। খাইবার পাখতুনখাওয়ার সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দুই নেতা বলেন, জনগণ ‘বিশৃঙ্খলার রাজনীতি’ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বৈঠক শেষে একটি যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রদেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণ ও উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিতে কেন্দ্রীয় সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বর্তমানে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পুনরায় সংলাপ শুরুর চেষ্টা চলছে। এই তৎপরতার মধ্যেই শনিবার পিটিআইয়ের লংমার্চ চারসাদ্দা থেকে মারদানের দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা। এই স্পর্শকাতর সময়েই বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মাওলানা ফজলুর রহমানের নাম সামনে এসেছে। পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়া শাখার সভাপতি জুনাইদ আকবর জানান, সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে মধ্যস্থতার জন্য দলটি জেইউআই–এফের প্রধানকে দায়িত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, পিটিআই চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গহর আলী খান নিঃশর্ত আলোচনার আহ্বান জানিয়ে দুই পক্ষকে সামনে এগোনোর পথ খুঁজে বের করার অনুরোধ করেছেন।
উল্লেখ্য, এর আগে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে দুই দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়ে গিয়েছিল। মূলত দুটি প্রধান বিষয়ে মতভেদ ছিল দুই পক্ষের। প্রথমটি হলো কারাবন্দী প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার পিটিআইয়ের দাবি। দ্বিতীয়টি হলো সন্ত্রাসবিরোধী নীতি নির্ধারণে খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের ভূমিকা। পিটিআইয়ের দাবি ছিল, কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের সমন্বয়ে একটি যৌথ কৌশল প্রয়োজন। বিপরীতে সরকারের অবস্থান ছিল, এই প্রক্রিয়ায় প্রাদেশিক প্রশাসনের সহযোগিতা অপরিহার্য।
লংমার্চের কর্মসূচি চলমান থাকলেই নতুন করে আলোচনার চেষ্টা শুরু হয়। পিটিআই নেতারা সংলাপের জন্য চাপ দিলেও সরকারি নেতারা দলটিকে বিক্ষোভ কর্মসূচি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
এর আগে সমঝোতার প্রাথমিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ৪ অক্টোবর লংমার্চ শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বহরটি চারসাদ্দা ও মারদান হয়ে সোয়াবিতে পৌঁছাবে। পিটিআই জানিয়েছে, সোয়াবিতে পৌঁছানোর পর তারা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে।
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি এবং প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের জল্পনা বাড়ছে। সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ১২টি জেলার জন্য আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ার একটি প্রস্তাব বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে। সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে কেন্দ্রীয় সরকার গভর্নরের শাসন বা জরুরি অবস্থাসহ বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছে।