পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে কেন্দ্র সরকারের জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তটি দেশটির পার্লামেন্ট কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। গতকাল বুধবার পাকিস্তানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাস হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সিনেটও ওই পদক্ষেপের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে অনুমোদন দেয়।
গত রোববার খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি করে কেন্দ্রীয় সরকার। এই পদক্ষেপের পেছনে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই থেকে প্রাদেশিক সরকারের ‘ইচ্ছাকৃতভাবে সরে দাঁড়ানোর’ অভিযোগ তোলা হয়েছে। উল্লেখ্য, ওই প্রদেশটিতে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল।
দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি সহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে পিটিআই।
সিনেটে প্রস্তাবটি অনুমোদনের আগে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে অত্যন্ত উত্তপ্ত বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সেই সময়ে আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার সিনেটে প্রস্তাবটি উত্থাপন এবং তা অনুমোদনের প্রক্রিয়াগত বৈধতার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে সাফাই দেন।
জাতীয় পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় পিটিআই চেয়ারম্যান গহর আলী খান জানান, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় কেন্দ্রের জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত তাঁর দল ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছে। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন, “ইমরান খানের স্ত্রী বা বোনেরা কী ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত ছিলেন যে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে?”
কারাবন্দী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দেওয়ার পর রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকার গত রোববার খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি ঘোষণা করে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণাসংক্রান্ত প্রস্তাবটি পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে উত্থাপন করেন পার্লামেন্টবিষয়ক মন্ত্রী তারেক ফজল চৌধুরী।
পিটিআইয়ের হুমায়ুন মোহমান্দ বলেন, স্বতন্ত্র সিনেটর ফয়সাল ওয়াদা কয়েক মাস আগেই বলেছিলেন যে (খাইবার পাখতুনখাওয়ায়) গভর্নরের শাসন জারি করা হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “এই পদক্ষেপের কারণ হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে সামনে আনা হলেও তা আসলে একটি অজুহাত; প্রকৃত লক্ষ্য পিটিআই।”
সিনেটের কার্যক্রমের কথা বলতে গেলে, বিরোধীদের তীব্র প্রতিবাদের মধ্যেই গতকাল বুধবার প্রস্তাবটি পাস হয়। এই সময়ে পিটিআইয়ের সিনেটররা প্রতিবাদস্বরূপ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। সিনেটে প্রস্তাবটি অনুমোদনের আগে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে যে উত্তপ্ত বিতর্ক চলে, সেখানে আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার প্রক্রিয়াগত বৈধতার পক্ষে সাফাই দেন।
বিরোধী দল যখন প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানাতে থাকে, তখন সিনেট চেয়ারম্যান ইউসুফ রাজা গিলানি তাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। বিরোধী দলের সিনেটররা স্লোগান দিতে থাকলে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটা কোনো শ্রেণিকক্ষ নয়, হইচই করবেন না।”
জাতীয় পরিষদের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে, জরুরি অবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য এদিন জাতীয় পরিষদের প্রশ্নোত্তর পর্ব স্থগিত করা হয়। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার আলোচনার সূচনা করেন এবং এরপর নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
জাতীয় পরিষদের আনুষ্ঠানিক এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়েছে, “সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারার দ্বিতীয় শর্তের অধীন ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে প্রেসিডেন্টের জারি করা জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় পরিষদ।”
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট যদি নিজ উদ্যোগে জরুরি অবস্থা জারির কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে সেই ঘোষণার বিষয়টি ১০ দিনের মধ্যে অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে উপস্থাপন করতে হয়।
বুধবারের পুরো অধিবেশনজুড়েই জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলের সদস্যরা শান্তভাবে অংশ নেন। কেন্দ্রের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে অতীতে পিটিআই যেভাবে উচ্চ স্বরে প্রতিবাদ করেছে, এবার তেমন কোনো বিক্ষোভ তারা করেননি। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অধিবেশনের কিছু অংশে উপস্থিত ছিলেন।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দেন। একই সঙ্গে তাঁরা সমালোচনা করে বলেন যে, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পিটিআই-নেতৃত্বাধীন খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
এদিন পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি বলেন, পিটিআই খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করতে কেন্দ্র সরকারকে বাধ্য করেছে। সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি পিটিআইকে দায়ী করেন এবং এটিকে দলটির জন্য একটি “রাজনৈতিক আত্মঘাতী হামলা” বলে অভিহিত করেন।
একইভাবে, তিনি পিটিআইয়ের আটক এমএনএ ও এমপিএদের কথা উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন।
শাহবাজ সরকার সংবিধানের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দুটি অনুচ্ছেদের আওতায় খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেয়। এর ফলে সেখানে পিটিআই পরিচালিত প্রাদেশিক সরকারের সব কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে গেছে।
সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে চলমান এই দ্বন্দ্বে সমঝোতার চেষ্টা করেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-পাকিস্তানের (জেইউআই-এফ) নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান।
শাহবাজ সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছে পিটিআই। গহর আলী খান জানিয়েছেন, গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির বিরুদ্ধে তাঁরা হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, পিটিআই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার। তিনি আরও বলেন, এই অভিশাপ মোকাবিলায় ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান (এনএপি) অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে।