পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। উল্লেখ্য, এই প্রদেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন দল তেহরিক-ই-পাকিস্তান (পিটিআই) বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা এড়ানোর সুযোগ এখন খুব কম বলেই মনে হচ্ছে।

কারাবন্দী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তাঁর দলের নেতা ও কর্মীরা গত ৪ অক্টোবর খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ থেকে রাজধানী ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে লংমার্চ শুরু করেছিলেন। তবে গতকাল সপ্তম দিনেও সেই লংমার্চটি এই প্রদেশের মধ্যেই অবস্থান করছে। ইমরানের মুক্তি এবং আরও কিছু বিশেষ দাবিদাওয়া নিয়ে পিটিআই ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়েছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে গতকাল প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে। অন্যদিকে, পিটিআই হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে যে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি কিংবা গভর্নরের শাসন কোনো স্থায়ী সমাধান আনবে না।

জিও নিউজের এক প্রতিবেদনে সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, গতকাল সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন যে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা খুব শীঘ্রই এই পদক্ষেপে অনুমোদন প্রদান করবে। এই বিষয়ে পার্লামেন্টের প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য আগামী মঙ্গলবার উভয় কক্ষের অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি বলেন, “জরুরি অবস্থা এড়ানোর সুযোগ খুব কম বলেই মনে হচ্ছে।” তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট আছে কি?” অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জিও নিউজকে জানিয়েছেন, বৈঠকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত পরামর্শ ও আলোচনা চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, জরুরি অবস্থা জারি করা সরকারের প্রথম পছন্দ নয়, তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে চূড়ান্ত বা শেষ পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, যদি অন্য কোনো বিকল্প পথ অবশিষ্ট না থাকে, তবে সাংবিধানিক পথ অবলম্বন করতে হতে পারে।

প্রতিমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন যে, জাতীয় নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে এবং সাধারণ জনগণকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ক্ষমতাসীন পিটিআই কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করছে না। তিনি আরও বলেন, পাখতুনখাওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নিজস্ব স্বার্থ নেই, বরং পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থই তাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

গতকাল ইসলামাবাদে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তাঁদের এই বৈঠকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মতবিনিময় করা হয়। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী মঙ্গলবার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের পৃথক অধিবেশন আহ্বান করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ একমত হয়েছেন।

পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান গওহার আলী খান স্পষ্ট করে বলেছেন, খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি কিংবা গভর্নরের শাসন কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। জিও নিউজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “একটি নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক সরকারকে দুর্বল করে দিয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, অন্য কোনো প্রদেশে এ ধরনের হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না এবং পিটিআই জনরায় পেয়েছে বলেই খাইবার পাখতুনখাওয়াকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

এদিকে গতকাল রাত পৌনে আটটার দিকে পিটিআইয়ের এক্স হ্যান্ডেলে জানানো হয়, খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা সোহেল আফ্রিদি লংমার্চের সপ্তম দিনে চারসদ্দা থেকে সোয়াবির পথে রওনা হওয়ার আগে অংশগ্রহণকারী নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “আমি চারসদ্দার বীর জনতার আবেগ ও উদ্দীপনাকে সালাম জানাই এই আবেগ ও উদ্দীপনা নিয়েই আমরা নিপীড়নব্যবস্থাকে দাফন করব।” তিনি আরও জানান, ১১ অক্টোবর (আজ) দেশের মানুষ সোয়াবির উদ্দেশে রওনা হবে এবং আগামী মঙ্গলবার সেখানেই পরবর্তী করণীয় ঘোষণা করা হবে।

সোহেল আফ্রিদির নেতৃত্বে গত ৪ অক্টোবর পাখতুনখাওয়া থেকে এই লংমার্চ শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৮ অক্টোবর লংমার্চটি ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা থাকলেও তা এখনো খাইবার পাখতুনখাওয়াতেই অবস্থান করছে। যে সোয়াবিতে পৌঁছে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করার কথা বলা হচ্ছে, সেই এলাকাটি মূলত পাখতুনখাওয়া ও পাঞ্জাব প্রদেশের সীমান্ত অঞ্চল।

উল্লেখ্য, পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাবন্দী। বেশ কয়েকটি মামলায় তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে দলীয় নেতা ও কর্মীদের অভিযোগ, সাজানো মামলায় বেআইনিভাবে ইমরান খানকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মুক্তি এবং অন্যান্য দাবিতেই ৪ অক্টোবর খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে ইসলামাবাদের দিকে লংমার্চ শুরু করে পিটিআই। তবে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে লংমার্চটি এখনো খাইবার পাখতুনখাওয়ায় আটকে রয়েছে।