সমকালীন সাহিত্যের আঙিনায় কবি জুনান নাশিত তাঁর লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন আধুনিক পৃথিবীর এক রূঢ় ও যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতাকে। তাঁর সাম্প্রতিক কবিতা ‘ক্ষরণ’-এ ফুটে উঠেছে পুঁজিবাদের করাল গ্রাস এবং তার ফলে মানবসত্তার যে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে, তার এক করুণ আখ্যান। কবি এখানে নিজের সৃজনশীল অক্ষমতা এবং বাহ্যিক চাপের এক দ্বন্দ্বে আটকা পড়েছেন।

কবিতার শুরুতেই কবি তাঁর সেই ব্যর্থতার কথা জানিয়েছেন যেখানে তিনি লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। তিনি লিখেছেন, “কথা ছিল কবিতা লেখার, বাল্মীকি স্বভাবেলিখতে পারিনিলেখার দুহাত জ্বলন্ত কয়লা হয়ে পোড়েতমসার তীরে।” এই পঙ্ক্তিগুলোর মাধ্যমে কবির ভেতরের তীব্র দহন এবং সৃজনশীলতার পথে আসা অন্তরায়গুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

প্রকৃতির বিষণ্ণতার সাথে মিলিয়ে কবি বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে বর্ণনা করেছেন। আশ্বিন মাসের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে একাকী কাকতাড়ুয়ার হাঁটার মধ্য দিয়ে তিনি পুঁজিবাদের ধ্বংসাত্মক রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন। কবির ভাষায়, “আশ্বিনে কুয়াশা নামে মাঠেহিম হিম ভোরেকাকতাড়ুয়া একাকী হাঁটে আর বলেক্রোনি ক্যাপিটালিজম এমনইপৃথিবী বিপন্ন করে, আনুগত্যে বিচ্ছিন্ন মানুষযুদ্ধ, মারণাস্ত্র, ভয় জ্যামিতিক হারে বাড়েচোখের কৌণিকে জমে মুনাফা ও পিত।” এখানে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনপ্রীতিমূলক পুঁজিবাদের যে কথা বলা হয়েছে, তা বর্তমান বিশ্বের এক চরম সত্য। মুনাফার লোভে মানুষ কীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং যুদ্ধ ও মারণাস্ত্রের ভয় কীভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তা কবির দৃষ্টিতে অত্যন্ত স্পষ্ট।

কবি চেয়েছিলেন এই দুঃসহ সময়ের কথা লিখে রাখতে, যেখানে স্বজন তোষণ এবং শ্রেণির ভেতরের ক্ষোভ প্রকট। তিনি ভেবেছিলেন, “ভেবেছি এসব লিখে রেখে যাবভূমধ্য পীড়ার কাল, স্বজন তোষণশ্রেণিতে শ্রেণিতে ক্ষোভনকশার ইজারা উধাও হলেকীভাবে লুণ্ঠিত হয় মানবজনম।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল পুঁজিবাদের প্রবল চাপে তাঁর সেই অভিপ্রায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

কবিতার শেষাংশে ডিজিটাল পুঁজিবাদের যে নির্দেশ বা চাপ শিল্পীর ওপর প্রযুক্ত হয়, তা অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে উঠে এসেছে। কবি আক্ষেপ করে বলেছেন যে তিনি কিছুই লিখতে পারেননি। কারণ ডিজিটাল পুঁজিবাদ তাঁকে শিখিয়েছে এক ভিন্ন পথ। কবির ভাষায়, “ডিজিটাল পুঁজিবাদ আমাকে শেখায়, বলে—‘শিল্পীসত্তা ভেঙে দাও,হাতের মুঠোতে তোলোদিশাহীন কঙ্কালের সুর।’” এই পঙ্ক্তিটি বর্তমান যুগের শিল্প ও সাহিত্যের বাণিজ্যিকীকরণ এবং সৃজনশীলতার বিনাশের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।