সাহিত্যের আঙিনায় নতুন এক কাব্যিক উপলব্ধির কথা শুনিয়েছেন কবি মাহফুজা অনন্যা। তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত রূপক এবং মানসিক দ্বন্দ্বের আখ্যান, যার শিরোনাম ‘সময়ের শূল-ধ্বনি’। এই কবিতায় কবি প্রকৃতির ছদ্মবেশ এবং অন্তরের গোপন যন্ত্রণার এক নিপুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার শুরুতেই দেখা যায় এক অদ্ভুত পরিচয়। কবি লিখেছেন, “বটের ছদ্মবংশ পরিচয় দিয়েছিল সে—আকাশ-আটকানো শেকড়ের আত্মজীবনী শুনিয়েছিল দীর্ঘক্ষণ...ছায়ার নাগরিকত্ব চাইতেই দেখি, সবুজ কেবল তার মুখোশ; ভেতরে সে এক কণ্টকগ্রহ—সবুজের ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘ ক্যাকটাস; হৃদয়ের প্রতিটি কোষে থোকা থোকা কাঁটার কৃষি।”

এই রূপকের মাধ্যমে কবি সম্ভবত মানুষের বাহ্যিক কোমলতা এবং অভ্যন্তরীণ কঠোরতার বৈপরীত্যকে তুলে ধরেছেন। যেখানে বাইরের সবুজ আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক কণ্টকময় বাস্তবতা। কবির ভাষায়, “যেখানে প্রতিটি স্পন্দন ক্যাকটাসের গোপন চারণভূমি—ব্যথাকাঁটা। বাক্যকাঁটা। তালকাঁটা। বিলকাঁটা। স্মৃতিকাঁটা। মাথাকাটা! সভ্যতার জিভেয় আটকে থাকা অদৃশ্য শূল-পরাগ।রক্তের ভেতর জন্ম নেওয়া অদৃশ্য কণ্টকলিপি!”

কবিতার পরবর্তী অংশে এই যন্ত্রণার তীব্রতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কবি বর্ণনা করেছেন কীভাবে এই অদৃশ্য কাঁটাগুলো অস্তিত্বকে গ্রাস করে। তিনি লিখেছেন, “তার স্পর্শে জলও মরুভাষা শিখে যায়, বাতাস নিজের ফুসফুস নিজেই নির্বাসিত করে।”

কবিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে এক ধরণের মুক্তি এবং সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তটি উঠে এসেছে। কবি লিখেছেন, “একদিন, পাণিপীড়িতের সুমধুর শীৎকারে বুকের গহ্বর খুলে গেল—তখন কণ্ঠের অতল উল্টে দিয়ে উগরে দিই—বহুযুগের অজগর!বটের মুখোশ খুলতেই দৃষ্টিগোচর হলো—ক্যাকটাসের রক্তস্নান; বুঝলাম—সে কেবল নিজের অহংকারে জন্মানো এক নির্জন কণ্টক-উপনিবেশ।”

সামগ্রিকভাবে, মাহফুজা অনন্যার এই কবিতাটি কেবল প্রকৃতির বর্ণনা নয়, বরং এটি মানুষের অন্তরের একাকীত্ব, অহংকার এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা যন্ত্রণার এক কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ।