প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে নানা পাটেকর নিজেকে নানা রূপে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। কখনো তিনি হয়ে উঠেছেন ভয়ংকর খলনায়ক, কখনো প্রতিবাদী মানুষ, আবার কখনো পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা নিখাদ কমেডিয়ান—চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙেছেন তিনি। তাঁর অভিনয়ের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সংলাপ বলার এক অনন্য ধরন, চোখের তীব্র ভাষা এবং চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষমতা। দীর্ঘ এই পথচলায় নানা পাটেকরের এমন কিছু সিনেমা রয়েছে যা দর্শক হিসেবে মিস করা অসম্ভব। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে জেনে নেওয়া যাক তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা ১০টি সিনেমা সম্পর্কে।
‘পারিন্দা’
নানা পাটেকরের অভিনয় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সিনেমা হিসেবে ‘পারিন্দা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিধু বিনোদ চোপড়ার নির্দেশিত এই অপরাধভিত্তিক চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেন ভয়ংকর গ্যাংস্টার আন্নার চরিত্রে। চরিত্রটি ছিল নির্মম, তবে তা কেবল একমাত্রিক ছিল না; বরং এর ভেতরে মিশে ছিল রাগ, হতাশা ও এক ধরণের অস্থিরতা। এই চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন। ছবিটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়।
‘ক্রান্তিবীর’
যদি এমন একটি সিনেমা বেছে নিতে হয় যা নানা পাটেকরের অভিনয়-ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রতীক, তবে ‘ক্রান্তিবীর’ তালিকার শীর্ষে থাকবে। প্রতাপ নারায়ণ তিলকের চরিত্রে তাঁর অভিনয়ে ফুটে উঠেছিল তীব্র ক্ষোভ, প্রতিবাদ, হতাশা ও আবেগ। সামাজিক অবিচার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এই চরিত্রের জন্য নানা পাটেকর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সেরা অভিনেতার সম্মান পান। পাশাপাশি তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারেও ভূষিত হন। সম্প্রতি তাঁর মৃত্যুর খবরের পর সিনেমাটির সেই বিখ্যাত বক্তৃতার দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
‘নটসম্রাট’
জীবনের শেষ পর্যায়গুলোর অন্যতম সেরা অভিনয়টি তিনি দিয়েছেন ‘নটসম্রাট’-এ। এই মারাঠি সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন অবসর নেওয়া কিংবদন্তি মঞ্চ অভিনেতা গণপতরাও বেলওয়ালকরের চরিত্রে। মঞ্চের ঝলমলে আলো থেকে অবসরজীবনের নিঃসঙ্গতা—একজন অভিনেতার জীবনের উত্থান-পতনকে তিনি অসাধারণ আবেগের সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই চরিত্রটি প্রমাণ করে যে, বয়স বাড়লেও নানা পাটেকরের অভিনয়ের তীব্রতা বিন্দুমাত্র কমেনি। এই অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি মারাঠি ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান।
‘আব তক ছাপ্পান’
পুলিশি অপরাধজগতের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘আব তক ছাপ্পান’ সিনেমায় নানা পাটেকর অভিনয় করেন মুম্বাইয়ের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট সাধু আগাশের চরিত্রে। এখানে তাঁর অভিনয়ের ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা; অতিরিক্ত সংলাপ বা নাটকীয়তার বদলে তিনি ঠান্ডা মাথার এক পুলিশ কর্মকর্তার চোখেমুখে কঠোরতা ও ক্লান্তি ফুটিয়ে তুলেছেন। অপরাধভিত্তিক সিনেমাগুলোর মধ্যে এটি তাঁর অন্যতম স্মরণীয় কাজ।
‘অগ্নিসাক্ষী’
নানা পাটেকরের আরেকটি প্রভাবশালী অভিনয় দেখা যায় ‘অগ্নিসাক্ষী’ সিনেমায়। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় এতটাই জোরালো ছিল যে ১৯৯৭ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার সম্মান পান। ‘পারিন্দা’ ও ‘ক্রান্তিবীর’-এর পর এটি ছিল তাঁর তৃতীয় জাতীয় পুরস্কার, যা তাঁর প্রতি বড় এক স্বীকৃতি।
‘সালাম বম্বে!’
মীরা নায়ারের অস্কার মনোনীত সিনেমা ‘সালাম বম্বে’-তে নানা পাটেকরের উপস্থিতি তাঁর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ছবির মাধ্যমেই তিনি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পরিচিতি পান। মূলধারার বলিউডে বড় তারকা হয়ে ওঠার আগে নানা যে চরিত্রনির্ভর অভিনয়ের ওপর ভিত্তি করে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন, এই সিনেমাটি তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
‘ওয়েলকাম’
নানা পাটেকরকে কেবল গম্ভীর, রাগী বা ভয়ংকর চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর অভিনয়ের বিশাল ব্যাপ্তি বোঝা সম্ভব নয়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ‘ওয়েলকাম’ সিনেমাটি। উদয় শেঠি চরিত্রে তাঁর কমেডি টাইমিং দর্শকদের রীতিমতো চমকে দিয়েছিল। অনিল কাপুরের মজনু ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর রসায়ন সিনেমাটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। ভয়ংকর গ্যাংস্টার থেকে হাস্যরসের চরিত্র—নানা যে কতটা বহুমুখী অভিনেতা, ‘ওয়েলকাম’ তার জনপ্রিয় প্রমাণ।
‘অপহরণ’
প্রকাশ ঝার রাজনৈতিক-অপরাধভিত্তিক সিনেমা ‘অপহরণ’-এ নানা পাটেকর অভিনয় করেন তেহেলকা যাদবের চরিত্রে। চরিত্রটির মধ্যে ছিল ক্ষমতার লড়াই, রাজনীতি এবং অপরাধজগতের জটিল সমীকরণ। এই অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ারে সেরা খলনায়কের পুরস্কার পান। উল্লেখ্য, এর আগে ‘অঙ্গার’ সিনেমার জন্যও তিনি একই বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছিলেন।
‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’
সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ সিনেমায় নানা পাটেকরকে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবেগঘন চরিত্রে। শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী দম্পতির পরিবারকেন্দ্রিক এই গল্পে তাঁর অভিনয়ে ছিল গভীর সংযম ও আবেগ। ‘অগ্নিসাক্ষী’র মতো এই সিনেমাটিও নব্বইয়ের দশকে নানা পাটেকরের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
‘রাজনীতি’
আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির পটভূমিতে নির্মিত প্রকাশ ঝার ‘রাজনীতি’ ছিল একটি বড় তারকাবহুল সিনেমা। অজয় দেবগন, রণবীর কাপুর এবং নানা পাটেকরের মতো শক্তিশালী অভিনেতারা এতে অভিনয় করেন। নানা এখানে এমন এক রাজনৈতিক চরিত্রে অভিনয় করেন, যেখানে সরাসরি চিৎকারের চেয়ে কৌশল, অভিজ্ঞতা ও ক্ষমতার হিসাব ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই অভিনয় আবারও প্রমাণ করে যে, চরিত্র যত জটিল হয়, নানা পাটেকরের অভিনয়ের শক্তি তত বেশি প্রকাশ পায়।