শুরুতে নিজেকে কেবল গানের মানুষ হিসেবেই পরিচয় দিতেন মাসুম আজিজ। কিশোর বয়স থেকেই গান গাওয়া এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে একটি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ তাঁর জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। মূলত গানের কাজের জন্য নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যান। পরবর্তীতে মঞ্চ, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শকদের মনে বিশেষ জায়গা করে নেন এই গুণী শিল্পী। আজ সেই দর্শকপ্রিয় শিল্পীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারের অজানা কথাগুলো এখানে তুলে ধরা হলো।
ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করতে গিয়ে অভিনয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আন্তবিশ্ববিদ্যালয় হল নাটক প্রতিযোগিতার একটি নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তৈরির দায়িত্ব পেয়েছিলেন মাসুম আজিজ। সেই সময়ে নাটকের আবহ সংগীত তৈরিতে ক্যাসেট ব্যবহার করা হতো। নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল শফিক কামাল নামের এক শিক্ষার্থীর। কিন্তু নিয়মিত মহড়ায় উপস্থিত না থাকায় হলের প্রভোস্ট মাসুম আজিজকে তাঁর পরিবর্তে অভিনয়ের জন্য অনুরোধ করেন। এভাবেই প্রথম অভিনয়ের ‘প্রক্সি’ দিতে শুরু করেন তিনি। টানা সাত দিন অন্য অভিনেতার হয়ে মহড়ায় অংশ নেন মাসুম আজিজ। পরবর্তীতে শফিক কামাল নাটকটিতে অভিনয় করবেন না বলে জানিয়ে দিলে হল কর্তৃপক্ষ চরম বিপাকে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রভোস্ট শফিক হায়দার চৌধুরীর অনুরোধে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন মাসুম আজিজ। নাটকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পায়। এই স্বীকৃতিই তাঁর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অভিনয় থেকে নির্দেশনায়
প্রথম নাটকের অভাবনীয় সাফল্যের পর চট্টগ্রামের থিয়েটারের সঙ্গে মাসুম আজিজের যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পায়। পরের বছর আন্তহল নাটক প্রতিযোগিতায় নাটক নির্মাণের দায়িত্বও পান তিনি। ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘জ্বালা’ নাটকটি পরিচালনা করে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন তিনি। এই নাটকের জন্য আন্তবিশ্ববিদ্যালয় হলের সেরা নির্দেশক হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। পর পর অভিনয় ও নির্দেশনায় সাফল্য পাওয়ার পর তাঁর মনে হয় যে অভিনয়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব। তবে এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তাঁকে ঢাকায় আসতে হবে—এই সত্যটিও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।
ঢাকায় এসে সংগ্রাম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে মাসুম আজিজ ঢাকায় চলে আসেন। শিক্ষক শফিকুল আমানের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় প্রখ্যাত নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে। তবে ঢাকা থিয়েটারে কাজের সুযোগ খুব সহজে তাঁর কাছে আসেনি। বিভিন্ন সময়ে চাকরি করলেও অভিনয়ের প্রতি তীব্র টান তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি। জীবিকার তাগিিদতে তিনি প্রিন্টিং সরবরাহের ব্যবসা করতেন। পাশাপাশি বাসায় নিয়মিত হারমোনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ করতেন। অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে একসময় চাকরির নিরাপত্তার চেয়ে মঞ্চকেই তিনি বেছে নেন। পরে এস এম সোলায়মানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সোলায়মানের মাধ্যমে জামিল আহমেদের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল’ নাটকে ডিসি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হলে মঞ্চে তাঁর পথচলা আরও দৃঢ় হয়। এরপর ঢাকা পদাতিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয় চালিয়ে যান তিনি।
মঞ্চ থেকে টেলিভিশনে
দীর্ঘদিন মঞ্চে অভিনয়ের পর ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় শুরু করেন মাসুম আজিজ। এরপর মঞ্চ ও টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও কাজ করেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদের ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’ ও সালাহউদ্দিন লাভলুর ‘তিন গ্যাদা’সহ নানা জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০০৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার ও নাট্যনির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন মাসুম আজিজ। সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘সনাতন গল্প’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন তিনি। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০২২ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়।
গান দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত অভিনয়ই হয়ে ওঠে মাসুম আজিজের জীবনের প্রধান ভালোবাসা। এক সাক্ষাৎকারে মঞ্চের প্রতি তাঁর টান বোঝাতে বলেছিলেন, ‘আমি যদি মঞ্চে অভিনয় করতে করতেই মারা যেতাম, তাহলে আমি হতাম ভাগ্যবান ব্যক্তি।’
মাসুম আজিজের মৃত্যুর ৪ বছর
তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার ও হৃদ্রোগে ভুগছিলেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের শুরুর দিকে তাঁর ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে মৃত্যুর চার দিন আগে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চার বছর আগে আজকের দিনে, ১৭ অক্টোবর ২টা ৪৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।