এক সময় ছিল না কোনো কাজ, পকেটে ছিল না অর্থ। টানা পাঁচ বছর বেকারত্বের দীর্ঘ লড়াই। অবশেষে নিজের লেখা ও পরিচালনায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী নির্মাতা মনোজ কুমার। তবে এই স্বপ্নপূরণের পথটি ছিল অত্যন্ত বন্ধুর। সিনেমাটি বানানোর সময় অর্থসংকট এতটাই প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, শুটিংয়ের কাজ চালিয়ে নিতে নিজের মায়ের মঙ্গলসূত্র বন্ধক রাখার কথা পর্যন্ত ভাবতে হয়েছিল তাঁকে। সেই চরম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নির্মিত সিনেমাটিই এখন বক্স অফিসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কন্নড় ভাষার রোমান্টিক পারিবারিক চলচ্চিত্র ‘প্রেমাদা উরাল্লি’ মাত্র আড়াই কোটি টাকার বাজেটে নির্মিত হয়ে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আয় করেছে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। যাত্রার শুরুতে বড় কোনো প্রচারণা কিংবা তারকা-নির্ভর জমকালো আয়োজনের সাহায্য নেওয়া হয়নি। তবে দর্শকদের প্রবল আগ্রহের কারণে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে প্রদর্শনীর সংখ্যা। চলচ্চিত্রবিষয়ক বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানের ওয়েবসাইট স্যাকনিল্কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম ২০ দিনে ছবিটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৭৫ কোটি টাকায়। এই সময়ের মধ্যে ৪০ লাখেরও বেশি দর্শক প্রেক্ষাগৃহে বসে ছবিটি উপভোগ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম দিন আয় ছিল মাত্র ১০ লাখ টাকা
‘প্রেমাদা উরাল্লি’র শুরুর দিকটা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। ২৫ সেপ্টেম্বর মুক্তির দিনে মাত্র ৬০টি প্রদর্শনী থেকে সিনেমাটি আয় করতে পারে প্রায় ১০ লাখ টাকা। তবে পরবর্তী কয়েক দিনে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ফলে দ্রুত বাড়তে থাকে প্রদর্শনীর সংখ্যা। ফিল্মিবিটের দেওয়া তথ্যমতে, মুক্তির ১৫তম দিনে ছবিটি ১ হাজার ১৭৮টি প্রদর্শনী পেয়েছিল। ওই নির্দিষ্ট দিনে ছবিটির মোট আয় ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
মুক্তির তৃতীয় রোববারও ছবিটির ব্যবসায়িক সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ওই দিন ১ হাজার ২৯১টি প্রদর্শনী থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকা আয় হয় এবং প্রেক্ষাগৃহে দর্শক উপস্থিতির হার ছিল ৮৩ শতাংশ। পরের দিনগুলোতেও সিনেমাটি তার ব্যবসায়িক ধারা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
নির্মাতার জীবনে পাঁচ বছরের অনিশ্চয়তা
এই অভাবনীয় সাফল্য বুঝতে হলে পরিচালক মনোজ কুমারের জীবনের কঠিন দিনগুলোর দিকে তাকাতে হবে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী ‘অক্ষি’ নির্মাণের পর তিনি প্রত্যাশামতো কাজ পাননি। পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর পরিচালনায় আরও অনেক সিনেমা নির্মিত হবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে।
কন্নড় সংবাদমাধ্যম ‘কন্নড় প্রভা’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মনোজ জানিয়েছেন, নতুন গল্প নিয়ে কাজ করতে চাইলেও প্রযোজক খুঁজে পাওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না। এক পর্যায়ে তিনি ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘অক্ষি’র সহপ্রযোজক দেবেন্দ্র তাঁর নতুন এই ছবিটি প্রযোজনায় আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই সহযোগিতার হাতই ‘প্রেমাদা উরাল্লি’ নির্মাণের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
ছবিটির মোট বাজেট ছিল প্রায় আড়াই কোটি রুপি। বড় তারকাদের ভিড় না করে নতুন অভিনয়শিল্পীদের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন পরিচালক। তবে অভিজ্ঞ অভিনেতা রঙ্গায়ণ রঘুকে ছবিতে যুক্ত করা তাঁর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। ছবিতে রঘু অভিনয় করেছেন বাবা নাগান্নার চরিত্রে এবং তাঁর ছেলের ভূমিকায় দেখা গেছে শ্রী রামকে।
বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের আদলে প্রচারণা
বড় কোনো তারকা নেই, প্রচারণার জন্য বিপুল অর্থও নেই—এমন একটি ছবিকে সাধারণ দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাই ছিল নির্মাতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট কাটাতে প্রচলিত বিপণন কৌশলের বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করে ছবির দল।
ফিল্মিবিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের আদলে কার্ড ছাপিয়ে বাসে যাতায়াতের সময় যাত্রীদের হাতে সেগুলো তুলে দেওয়া হয়। কার্ডে ছবিটি একবার দেখে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয় তাঁদের। অর্থাৎ বড় বিজ্ঞাপন বা তারকাদের সাক্ষাৎকারের পরিবর্তে সরাসরি সাধারণ দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন নির্মাতারা।
প্রথম দিকে ছবিটির প্রদর্শনী ছিল সীমিত। কিন্তু দর্শকদের মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। কন্নড় প্রভাকে মনোজ জানিয়েছেন, প্রথম সপ্তাহে কম প্রদর্শনী পাওয়াকে তাঁরা একসময় ইতিবাচকভাবেও দেখেছেন। অল্পসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে দর্শক একসঙ্গে জড়ো হওয়ায় সেখানকার উচ্ছ্বাস অন্য দর্শকদের কাছেও দ্রুত পৌঁছায়। ফলে ছবিটি নিয়ে আলোচনা বাড়তে থাকে এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ে প্রদর্শনীর সংখ্যাও।
গল্পে কী আছে
‘প্রেমাদা উরাল্লি’ মূলত গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত একটি রোমান্টিক ও পারিবারিক ছবি। ছবির গল্পের মূল উপজীব্য হলো বাবা ও ছেলের সম্পর্ক, বিয়ে, ভালোবাসা এবং গ্রামের জীবনযাপনের নানা দিক। মনোজ কুমারের ভাবনায়, গ্রামীণ গল্প মানেই শুধু হাস্যরসনির্ভর সিনেমা নয়; গ্রামের মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেও গল্প বলা সম্ভব।
কন্নড় প্রভাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরিচালক জানান, ছবির গল্পের কেন্দ্রে এমন একটি পরিবার, যেখানে মা নেই; বাবা ও ছেলেকে ঘিরেই পরিবারের জীবন। আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েও ছেলের বিয়ে হচ্ছে না—এমন একটি পরিস্থিতি থেকে গল্পের সূত্রপাত। পরিচিত সামাজিক বাস্তবতা ও পারিবারিক আবেগকে কেন্দ্র করেই তিনি এই চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন।