গত ৮ অক্টোবর ভারতের প্রখ্যাত অভিনেতা নানা পাটেকরের আকস্মিক প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল চলচ্চিত্র অঙ্গনে। সম্প্রতি গোয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক তাঁর ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, যার মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সামনে এসেছে। এনডিটিভির বরাতে এই তথ্য জানা গেছে।

ময়নাতদন্তের বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অ্যাথেরোস্ক্লেরোটিক করোনারি আর্টারি ডিজিজের কারণে তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রের বাঁ দিকের প্রধান করোনারি ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধেছিল। এর ফলে তিনি তীব্র হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। চিকিৎসকদের মতে, এই নির্দিষ্ট ধমনিটি হৃদ্‌যন্ত্রের একটি বিশাল অংশে রক্ত সরবরাহ করে থাকে। ধমনিটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হৃদ্‌যন্ত্রে রক্তপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর ভোররাতে গোয়ার ডোনা পাউলায় অবস্থিত নিজ বাসভবনে অসুস্থ বোধ করেন ৭৫ বছর বয়সী এই অভিনেতা। রাত আড়াইটার দিকে তিনি এক বন্ধুকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যেখানে শরীর খারাপ লাগা এবং বুকের বাঁ পাশে তীব্র ব্যথার কথা উল্লেখ করেন। তবে রাত গভীর হওয়ায় বন্ধুটি তাৎক্ষণিকভাবে বার্তাটি দেখতে পাননি।

পরবর্তীতে ভোর চারটার দিকে ওই বন্ধু নানার বাড়িতে পৌঁছালে তাঁকে প্রচণ্ড ঘামতে এবং শ্বাসকষ্টে ভুগতে দেখেন। দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ভোরের দিকে তাঁকে মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন চিকিৎসকেরা। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।

প্রাথমিকভাবে এই মৃত্যুর ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর একটি মামলা নথিভুক্ত করেছিল গোয়া পুলিশ। তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এটি হৃদ্‌রোগজনিত একটি স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নানা পাটেকর। প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে কখনো কঠোর, কখনো আবেগপ্রবণ, আবার কখনো অত্যন্ত জটিল মানসিকতার চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মনে এক স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি।

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘রাজু বান গয়া জেন্টলম্যান’, ‘অঙ্গার’, ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’ ও ‘অপহরণ’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। এছাড়া মীরা নায়ারের বিখ্যাত ‘সালাম বম্বে!’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি লাভ করেন এই অভিনেতা।

অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা ও চিত্রনাট্য রচনার ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৯৯১ সালে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালনায় তাঁর অভিষেক হয়। অভিনয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।

ব্যক্তিগত জীবনে নানা পাটেকরের স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকর এবং ছেলে মালহার পাটেকর। জানা যায়, তাঁদের দাম্পত্য জীবনে নানা টানাপোড়েন ছিল এবং দীর্ঘ সময় তাঁরা আলাদা থাকলেও বিবাহবিচ্ছেদ করেননি। তাঁদের বড় ছেলে দুর্বাসা মাত্র আড়াই বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।