২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয় করেছেন প্রখ্যাত কবি অ্যান কারসন। তাঁর কাব্যপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় আরও আগে। ২০১৯ সালের অমর একুশে বইমেলায় চিত্রা প্রকাশনী থেকে রাজ রিডারের সংকলিত ‘অনুবাদে আধুনিক মার্কিন কবিতা’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত সংকলনে সাতজন বিশিষ্ট কবির কবিতা স্থান পেয়েছিল, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অ্যান কারসন। সেই সংকলন থেকে তাঁর বিশেষ কিছু কবিতার অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
কানাডায় ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করা অ্যান কারসনের শিক্ষাজীবন অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি মিশিগান, ম্যাকগিল এবং প্রিন্সটনের মতো বিশ্ববিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন। শৈশবে তিনি গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষায় পড়াশোনা করেন। সাহিত্যের নানা আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু নিয়ে তাঁর লেখালেখি বিস্তৃত। তাঁর মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফেলোশিপ এবং মর্যাদাপূর্ণ ‘লানান সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেছেন।
ব্যক্তিত্বের দিক থেকে অ্যান অত্যন্ত স্পষ্টভাষী এবং সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করেন। তাঁর লেখনীর গতি অত্যন্ত প্রখর এবং লেখায় পুরাণের প্রভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। তিনি দীর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত—উভয় ধরনের কবিতাই রচনা করেন। তবে তাঁর ছোট কবিতাগুলোর গভীরতা ও ওজন অনেক বেশি, যা পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। মাত্র চার লাইনের কবিতাতেও তিনি মহাকালের বিশাল সব ঘটনা ফুটিয়ে তুলতে পারেন। দীর্ঘকাল ধরে তিনি ঈশ্বরের সন্ধান করে চলেছেন, যার আভাস পাওয়া যায় তাঁর ‘আমার ধর্ম’ নামক কবিতায়।
তাঁর কবিতার কিছু অংশ নিম্নরূপ:
“এই মন্থর দিনটি বয়ে চলে; ঘরের সাথে আমি শুনতে পাই তার অক্ষের পদধ্বনি; একটি চলমান ঝলকানি ছাদের ওপরে যা দেয় আমাকে সেই তেজি নীল হলুদ অনুভূতি যখন সময় বয়ে চলে প্রশস্ত পথে আমার বিকেল বেলায়।”
“ধর্ম নামক বস্তুটির কোনো মাথামুণ্ডু খুঁজে পাই না আমি আর আমার কোনো কাজেও আসে না এটা তাই আমি তাকে তাড়া করে ফিরি।”
“যখন আমরা লক্ষ্য দেখি আসলে ব্যাপারটা কত সহজ হতে পারত তখন আমরা নিজেরা নিজেরাই মারামারি করব।”
“পৃথিবীর সব মানুষকে নিয়ে আমার একটি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যারা ঈশ্বর সন্ধান করে বেড়ায়, একটি ঘরে জটলা পাকিয়েছে, ঘরের পার্টিশনের এক দিকে, অপর দিক থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, যে দিকটা ঈশ্বরের; কিন্তু আমরা তো দৃষ্টিহীন। আমাদের কাজকামও ঠিক সেই একই রকম।”
“এই কানার মতো হাতড়ানো আরও কিছুকাল চলে যতক্ষণ না পর্যন্ত পার্টিশনের ওদিকে কিছু একটা ঘটে তারপর আবার তাদের দিকে আমরা দেখতে থাকি। ততক্ষণে অনেক বেশি দেরি হয়ে যায়।”
“আমরা দেখতে থাকি কত এবড়োখেবড়ো ভাবে কত সতর্কতার সাথে আর কত অসুস্থভাবে আমাদের অন্ধ কার্যকলাপ ব্যঙ্গ করে চলেছে যা ঈশ্বর চেয়েছিল; কত অল্প কিছু জিনিস”
“আর এই বিষয়টিই একটা প্রাণীর মতো ঘরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আর তা বের হওয়ার জন্য দাপড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এটা আমার ভেতরটাতেও ঠুকে চলছে তার রাইফেলের বাঁট দিয়ে।”
“বসন্ত সব সময় তেমনই আছে যেমনটা ছিল।” এক চীনা বৃদ্ধের কাছে শুনেছিলাম। জানালার কাছে বৃষ্টিগুলো ঝরে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়, আর ফুঁসে উঠছে, যেতে চেয়েছিল সীমানা ছাড়িয়ে। ছুটে এসেছে আমাদের কাছে।
“মেয়েটি দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। ভেজা ভুট্টা। হলুদ বিনুনি। পাছার নিচে।”
“চিত্রকর্মের মতো মুছে যাবে আমাদের নাম, কেউ থাকবে না।”
“আমি জীবন দেখেছি পথে পথে লাফিয়ে লাফিয়ে, নেকড়ের মতো, আর প্রশ্ন করেছি সেই মহিলাকে সেই স্থান সম্বন্ধে।”
“তারা কেউ কেউ মনে করে নেকড়ের মৃত্যু নেই আর এখন শোনো, এটা শুধু একটি ক্ষেত্রেই ঘটে অথচ নেকড়েরা প্রতিনিয়ত অনেক কারণে মারা যায়— ভাল্লুক তাদের মেরে ফেলে, বাঘ তাদের শিকার করে তারা মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়, স্যামন মাছের কাঁটাও বিঁধে যায় তাদের গলায়, মরার জন্য দৌড়ে যায় আর এর কারণ কেউ জানে না আর হয়তো তার কানের সমস্যার কথা কখনো শোননি।”
“তারা কানে খুব ভালো শোনে, মাথার ওপর দিয়ে মেঘ উড়ে গেলেও শুনতে পায়। আর কখনো কখনো এমন ঘটে, বাতাসে উড়ে আসা ধুলাবালু উড়ে এসে তাদের কানে ঢুকে যায় আর ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় তারা পাগল হয়ে ওঠে খাড়া হয়ে দাঁড়াবার জন্য, কোনো কিছুর সাহায্য না নিয়েই। ক্রোধে মারা যায়।”
“নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হবে শুধু এটুকুই জানতে পেরেছি আমরা।”
“প্রথমে সে ছোট ছোট ধাপ দেয় স্রোতকে কাজে লাগিয়ে। তারা তাকে যে নাম ধরে ডাকে, তা হলো হুইসল, শব্দটির মানে ‘বসন্তে দেখে ভালো লাগল’। বিষয়বস্তু যত কঠিন করবে, তত কঠিন হবে।”