সমকালীন সাহিত্যের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন সাহিত্যরীতির এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন অ্যান কারসন। তাঁর এই সাহসী ও উদ্ভাবনী প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়ে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ের ঘোষণা করেছে সুইডিশ একাডেমি। বৃহস্পতিবার কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক এবং ধ্রুপদি সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ অ্যান কারসনের নাম বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভালোবাসা, কামনা এবং হতাশার মতো মানবিক অনুভূতিগুলোকে কেন্দ্র করে তাঁর লেখা কাজগুলোতে প্রাচীন ঐতিহ্য ও রহস্যবাদের সাথে আধুনিকতার এক চমৎকার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।
সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিদ কার্লবার্গ নোবেল বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর অ্যান কারসনের সঙ্গে কথা বলেছেন। বর্তমানে আইসল্যান্ডে অবস্থানরত ৭৬ বছর বয়সী এই সাহিত্যিক এই খবরে বেশ চমকে গেলেও অত্যন্ত খুশি হয়েছেন বলে জানান সচিব। সুইডিশ একাডেমির পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে মেলবন্ধনের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ তৈরি করা তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের জন্য’ অ্যান কারসনকে এই সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে।
অ্যান কারসন কেবল একজন লেখকই নন, তিনি একাধারে ধ্রুপদি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং প্রাচীন ভাষা, সাহিত্য, নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসের একজন প্রথিতযশা পণ্ডিত। তাঁর লেখনীর বৈচিত্র্য ও শৈল্পিকতা আগেই নজর কেড়েছিল সমালোচকদের। ২০০১ সালে নিউইয়র্ক টাইমস তাঁকে ‘ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যরীতি চমৎকারভাবে মিলিয়ে লেখার ক্ষেত্রে এক অনন্য কারিগর’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।
নব্বইয়ের দশকে তাঁর লেখা ব্যতিক্রমী সমসাময়িক কবিতাগুলো তাঁকে সাহিত্যের জগতে প্রতিষ্ঠিত করে এবং বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার এনে দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৯৬ সালের ল্যানান অ্যাওয়ার্ড এবং ১৯৯৭ সালের পুশকার্ট প্রাইজ। এর ঠিক এক বছর পর প্রকাশিত হয় তাঁর আলোচিত কাজ ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’। গ্রিক পৌরাণিক কাহিনীকার দানব গেরিয়ন ও হেরাক্লেসের গল্পকে আধুনিক যুগের ত্রিভুজ প্রেমের আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলা এই কাব্য-উপন্যাসটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে।
সুইডিশ একাডেমির মতে, কারসনের প্রায় সব সাহিত্যকর্মের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘শব্দ নিয়ে ভাষাতত্ত্ববিদের ব্যাকুলতা আর নতুন অর্থ খোঁজার প্রতি কবির আকুলতার এক অপূর্ব মিলন।’ বিশেষ করে তাঁর ‘নক্স’ কবিতাটির কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে একাডেমি। ২০০০ সালে প্রয়াত ভাইয়ের স্মৃতিবিজড়িত এই কবিতাকে তারা ‘এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে, এই কবিতায় স্বজন হারানোর এক গভীর বেদনা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
বিবিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অ্যান কারসন ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে বসবাস করছেন, তবে ২০২২ সাল থেকে তিনি আইসল্যান্ডের নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। সুইডিশ একাডেমির নোবেল সাহিত্য কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডারস ওলসন কারসনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, কারসন আত্মকেন্দ্রিক বর্ণনামূলক কবিতার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সমকালীন সাহিত্যে নতুন আঙ্গিকের সূচনা ঘটিয়েছেন।
কারসনের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মগুলোর তালিকায় রয়েছে ‘দ্য গ্লাস এসে’, ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’, ‘নক্স’, ‘ফ্লোট’ এবং ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাসব্যান্ড: আ ফিকশনাল এসে ইন ২৯ ট্যাংগোস’।
উল্লেখ্য, আগামী কাল শুক্রবার শান্তি বিভাগে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। এছাড়া আগামী সোমবার অর্থনীতিতে এবারের নোবেল বিজয়ীর নাম জানানো হবে। এর আগে চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে নোবেল পুরস্কারের নাম ঘোষণা করা হয়ে গেছে।