কবিতা, প্রবন্ধ এবং অনুবাদের এক অনন্য সাহিত্যিক জগৎ তৈরি করেছেন কানাডীয় লেখক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য এবং সংস্কৃতির ওপর তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁর লেখায় এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। সম্প্রতি তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন গদ্য ‘অল্প কিছু কথা’ অনুবাদ করেছেন মুহম্মদ আহসান নাহিয়ান।
গদ্যটির শুরু হয় এক অদ্ভুত শূন্যতা দিয়ে। একদিন খুব ভোরবেলা শব্দগুলো হারিয়ে গিয়েছিল। তার আগে শব্দের কোনো অস্তিত্ব ছিল না; ছিল কেবল ঘটনা আর আবহ। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন যে “একটা ভালো গল্পে যা কিছুই ঘটে, তা ঘটানোর জন্য সব সময় অন্য কিছু একটা লাগে, যা বাকি সবকিছুকে ঘটনার দিকে ঠেলে দেয়।” একদিন কেউ একজন লক্ষ্য করলেন যে আকাশে তারা থাকলেও কোথাও কোনো শব্দ নেই। এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লেখক অনেকের কাছে প্রশ্ন করেন। তাঁর মতে, এটি একটি চমৎকার প্রশ্ন। মাঠে কাজ করা তিনজন বৃদ্ধার সাথে কথা বলে তিনি জানতে পারেন বরফে ঢাকা মাঠ, নীলচে-সবুজ অঙ্কুর এবং ‘দুঃসাহস’ নামের সেই গাছটি সম্পর্কে, যাকে কবিরা ভুল করে ভায়োলেট ভেবে থাকেন। লেখক সেই সব কথা টুকে রাখতে শুরু করেন। তাঁর কলমের আঁচ এক সহজাত মুহূর্ত তৈরি করে, যেখানে গল্পের কোনো একঘেয়েমি ছিল না। লেখক জোর দিয়ে বলেন, একঘেয়েমি এড়াতে তিনি যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। তাঁর মতে, কোনো কিছুকেই কখনোই যথেষ্ট মনে হয় না—না জানা, না কাজ করা, এমনকি ব্যাকরণের ইনফিনিটিভ বা পার্টিসিপল রূপের ব্যবহার কিংবা চলার গতিতে বাধা দেওয়ার বিষয়টিও। এমনকি কারও মন থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসাটাও তাঁর কাছে অসম্ভব মনে হয়।
তিল্পান্নটি ছোট পুস্তিকায় তিনি এই কথাগুলো লিখে রেখেছিলেন, যেখানে কথাগুলো একে অপরের থেকে বহুদূরে অবস্থান করে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তিনি সেগুলো পড়তেন, যতক্ষণ না কয়েকজন লোক এসে সেগুলো একটি কাঠের বাক্সে তালাবদ্ধ করে নিয়ে যায়। এরপর তিনি এক অদ্ভুত নির্দেশ পান—তাঁকে এমন এক আয়নার অনুকরণ করতে হবে যা পানির মতো, যদিও পানি আয়না নয় এবং তাকে আয়না ভাবা বিপজ্জনক। লেখক অপেক্ষা করছিলেন তারা চলে যাওয়ার জন্য, যাতে তিনি তাঁর লেখার বাদ পড়া অংশগুলো পূর্ণ করতে পারেন। লুকিয়ে রাখা তিনটি পুস্তিকা নিয়ে তিনি এখন সতর্ক। অ্যারিস্টটল সম্ভাব্যতা ও অনিবার্যতার কথা বলতেন, কিন্তু বিষাক্ত ড্রাগনের ছোঁয়া থাকা গল্প বা রত্ন দিয়ে কী হবে? লেখক উপলব্ধি করেন, সত্যিই কখনো যথেষ্ট কাজ করা সম্ভব হয় না।
স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে মায়ের কথা। মা আমাদের উল্টো দিকে হাঁটতে নিষেধ করতেন। মা বলতেন, “মৃত মানুষেরা এভাবেই হাঁটে।” লেখক ভাবেন, মা এই ধারণা perhaps কোনো ভুল অনুবাদ থেকে পেয়েছিলেন। কারণ, মৃত মানুষেরা পেছন দিকে হাঁটে না, তারা হাঁটে আমাদের পেছনে পেছনে। ফুসফুস না থাকায় তারা ডাক দিতে পারে না, তবে তারা খুব করে চায় আমরা যেন পেছন ফিরে তাকাই। তাঁদের অনেকেই আসলে ভালোবাসার শিকার। দিনের পর দিন ঘুম থেকে উঠেই লেখক প্রিয়তমার কথা ভাবেন, যখন বাতাসের মাঝে পাখিদের আর্তনাদ মণিমুক্তার মতো সাজানো থাকে।
গদ্যে স্থান পেয়েছে ফ্রানৎস কাফকার জীবনচিত্র। কাফকা তাঁর ঘড়ির সময় দেড় ঘণ্টা এগিয়ে রাখতেন এবং ফেলিসে তা ঠিক করে দিতেন। কাফকা ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “তারপরও আমরা একে অন্যকে যেমন আছি, ঠিক সেভাবেই ভালোবাসি।” ১৯১২ সালে ফেলিসের সোনার দাঁতের ঝলক তাঁর কাছে নারকীয় মনে হয়েছিল। বিয়ের পক্ষে-বিপক্ষে কাফকা একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন। নিজের জীবনের আক্রমণ সহ্য করতে না পারাটা ছিল বিয়ের পক্ষে যুক্তি, আর রাত সাড়ে দশটায় মা-বাবার বিছানায় শোয়ার জামা দেখে ফেলাটা ছিল বিপক্ষে। শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষরণ তাঁকে বাঁচিয়ে দিল। স্যানাটোরিয়ামের চিকিৎসকেরা যখন কথা বলতে নিষেধ করলেন, তিনি মেঝেজুড়ে কাচের বাক্য রেখে গেলেন। একটি বাক্যে লেখা ছিল, ফেলিসের ভেতরে তখনো অনেকখানি নগ্নতা বাকি ছিল। সুস্থ দাঁতগুলোও ছিল ভয়ংকর।
ভ্যান গঘ-এর কথা স্মরণ করে লেখা হয়েছে যে, তিনি হলুদ আকাশকে বোঝার জন্য মদ খেতেন। তাঁর দৃষ্টিতে পৃথিবীর সব রং পেরেক দিয়ে আটকানো ছিল এবং সেই পেরেকগুলো কষ্ট পাচ্ছিল। অন্যদিকে, ক্যামিল ক্লোদেল জীবনের শেষ ত্রিশ বছর কাটিয়েছেন মানসিক হাসপাতালে। তিনি তাঁর কবি ভাইকে চিঠি লিখতেন, যিনি তাঁকে সেখানে পাঠানোর কাগজপত্রে সই করেছিলেন। চিঠিতে তিনি লিখতেন, “আমাকে দেখতে এসো। মনে রেখো, আমি এখানে পাগল মেয়েদের সঙ্গে থাকি, দিনগুলো অনেক লম্বা মনে হয় আমার।” তিনি ধূমপান বা পায়চারি করতেন না, এমনকি ভাস্কর্য গড়তেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তাঁকে দেওয়া মার্বেল, গ্রানাইট ও পরফিরি পাথরগুলো তিনি ভেঙে ফেলে রাতের বেলা দেয়ালের বাইরে পুঁতে রাখতেন। রাতের আঁধারে তাঁর হাতগুলো অস্বাভাবিক বড় হয়ে যেত, যা ছবিতে দেখে মনে হতো অন্য কারও শরীরের অংশ হাঁটুর ওপর চাপিয়ে রাখা হয়েছে।
ফ্রানৎস কাফকা এবং তাঁর বোন ওটলা উভয়েই ইহুদি ছিলেন। ওটলা বিয়ে করেছিলেন অ-ইহুদি আইনজ্ঞ ইয়োসেফ ডাভিডকে। ১৯৪২ সালে নুরেমবার্গ আইন চালুর পর ওটলা বিবাহবিচ্ছেদের কথা বলেন। তিনি সম্পত্তি এবং দুই মেয়ের কথা আলোচনা করলেও আউশভিৎসের কথা বলেননি, কারণ সেই শব্দটি তাঁর জানা ছিল না। ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে তাঁর মৃত্যু হয়। যাওয়ার আগে ইয়োসেফ ডাভিড তাঁর জুতা পলিশ করে গ্রিজ মাখিয়ে দিয়েছিলেন যাতে সেগুলো ওয়াটারপ্রুফ হয়।
গদ্যে এক নারীর কথা আছে, যিনি পাত্র থেকে পাত্রে পানি ঢালার মতো মেয়ের ভেতরে প্রশ্ন ঢেলে দিতেন। লেখক বলেন, এটি কেবল মা বা কামনার ছবি আঁকা নয়। পানি ঢালার সময় এক মুহূর্ত আসে যখন পানি কোনো পাত্রেই থাকে না—সেই তৃষ্ণার মুহূর্তটি ছিল তীব্র। তিনি ভেবেছিলেন ক্যানভাস খালি হলে থামবেন, কিন্তু মেয়েটি পাত্র, পানি এবং মরণশীল মানুষের তৃষ্ণা চিনত। টেলিভিশনে তাঁর মাকে দেখা গিয়েছিল, যাঁর কথাগুলো ছিল পুড়ে যাওয়া ও সাদামাটা। তিনি কবিতার কথা বলেছিলেন, কিন্তু জঙ্গলের ভয়, ঘৃণা বা কান্নার কথা বলেননি। তিনি বলেছিলেন নিজেকে শাসন এবং পথের শেষের কথা, কিন্তু বাতাসের গুনগুন সুরের কথা বলেননি যা কেটে ফেলতে লেখক এসেছিলেন।
ক্যামিল ক্লোদেলের কথা পুনরায় ফিরে আসে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন পৃথিবীর সব জিনিস নিজের আলমারিতে সাজিয়ে রাখার। কোনো কিছুর অভাব বা হারিয়ে যাওয়া তিনি মেনে নিতে পারতেন না। নুহের ভেতর থেকে নীল ত্রিভুজের আকারে শৃঙ্খলা আসছিল এবং এক বিশুদ্ধ উন্মত্ততা তাঁর জীবনকে গ্রাস করছিল, যাকে অন্যরা ঢেউ বলে ডাকত। শেষ পর্যন্ত এক পৃথিবী মানুষ ডুবে গেল। বর্তমানে তাঁকে তিনজন পাগলের সঙ্গে এক ঘরে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়। যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বলা হয়েছে, লেখকের বাবা ছিলেন বিমানের নেভিগেটর। ফ্রান্সের ওপর দিয়ে উড়ানের সময় তিনি গুপ্তচরদের জন্য নাইলনের স্টকিংসের পার্সেল ফেলতেন। জার্মানরা যখন বিমানটি নামিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, “সে কোথায়?”, বাবা জার্মান ভাষা জানতেন না এবং বাকি তিনজন তখনো নিজেদের আসনেই মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন।
১৬৫৬ সালের সেই তীব্র শীতের কথা মনে পড়ে, যখন ব্ল্যাক ইয়ান এলসিয়ে ওটিয়ে নামের এক যৌনকর্মীর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু ২৭ জানুয়ারি এক চুরি ও খুনের দায়ে ব্ল্যাক ইয়ানকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ডক্টর ডেইমান তিন দিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ব্ল্যাক ইয়ানকে পর্যবেক্ষণ করেন। রেমব্রান্টের আঁকা ছবিতে দেখা যায়, চোর প্রেমিকের শরীর ছোট হয়ে এসেছে এবং তাঁর পায়ের তলা যেন মস্তিষ্ককে ছুঁয়ে ফেলছে। ডক্টর ডেইমান মস্তিষ্কটি দুই পাশে সরিয়ে বিষণ্ণতাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন।
লেখকের অনুভূতিতে ভালোবাসা হাত উঁচু করে চিৎকার করে বলছে, “চলো এটা কিনে ফেলি, খুব সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে!” আমরা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বেঁচে থাকি কারণ আমাদের জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। এমিলি ডিকিনসন ১৮৮৩ সালের এক চিঠিতে লিখেছিলেন, আমহার্স্ট থেকে এক ছোট ছেলে পালিয়ে ভারমন্ট অথবা এশিয়ার দিকে যাচ্ছে।
সবশেষে বলা হয়েছে, মাছের হৃৎপিণ্ডে ফসফরাস থাকায় তা দিয়ে দেয়ালে লেখা যায়। নদীর ধারের কুঁড়েঘরে এমন লেখা আছে— “বের হওয়ার সময় দরজাটা আবার পাল্টে দিও।” লেখক প্রশ্ন করেন, এই কথাটি কতখানি ভুল এবং কতক্ষণ তা জ্বলজ্বল করবে।